সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০১১

হরতালের পোষ্ট মর্টেম



আমরা কী করছি? আমরা কি সঠিক পথে এগুতে পারছি? সব ঠিক আছে আমাদের? আমরা কি দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখতে পারছি? আমার তিক্ত কথাগুলো হয়তো অনেকেরই পছন্দ হবেনা। তাতে কি! আমি তো আর আমার বোধ'র সাথে প্রতারণা করতে পারি না!


আমি ভাবি, বোধগুলো আমাদের কোথায় হারিয়ে গেলো?  আমার একটি ভাই, কওমী মাদরাসার একটি  ছাত্রকে মেরে ফেলা হলো গুলি করে, আমরা সেভাবে গর্জে উঠতে পারলাম না যেভাবে পারা উচিৎ ছিলো!  

যে যে দলই করুন, কওমী মাদরাসাগুলোর তো এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নিরব বসে থাকার কথা ছিলো না! আমি যশোরের হুসাইনের কথা বলছি। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দুর্ভাগ্যজনক নিরবতা আমাদের কষ্ট দিয়েছে খুব!


 অবশ্য মুরব্বীরা বসে থাকলেও বসে ছিলোনা দেশের কওমী ছাত্ররা। ভ্রাতৃত্বের টানে গতকাল তারা বেরিয়ে এসেছিলো রাস্তায়। তাদের মাঝে একটি অনুভূতিই কাজ করছিলো। আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, আমরা বসে থাকতে পারি না! 

৪এপ্রিল সারাদেশে হরতাল হয়েছে। মোটামুটি সফল হরতাল, বলাই যায়! এর প্রধান কারণ ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ছাত্ররা স্বতঃস্ফুর্তভাবে নেমে এসেছিলো রাজপথে। কে হরতাল ডেকেছেন, সেটা কোনো ব্যাপার ছিলো না।
আমাদের কথা হলো,  হরতালের আগের দিন যশোরে যে ছেলেটি মারা গেলো ,কিশোর ছেলেটি, আমার ভাইটি, তার কী হবে? আল্লাহর কাছে সে শাহাদাতের মর্যাদা পাবে, ঠিক আছে। নেতাদের কাছ থেকে সে কী পেলো? কেন্দ্র থেকে নেতারা কি কেউ গিয়েছিলেন ছেলেটির বাবা-মা'র কাছে? 
যাওয়া কি উচিৎ ছিলো না?
শান্তনার হাতটি রেখেছিলেন পুত্রহারানো বাবা লোকটির কাধে? 
রাখা কি উচিৎ ছিলো না?

হুসাইন নামক ভাইটি আমার মারা গেলো কোরআনের জন্য। সে ভাগ্যবান। দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা তাকে সামান্য সম্মানটুকু জানাতে পারলাম না ! গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের মতো আমরাও  কি ব্যবহার করলাম  হুসাইনকে! তার লাশকে ব্যবহার করলাম হরতালের ঢাল হিসেবে??

কেনো বলছি এ কথা?
কারণ, আমি যদ্দুর জানি, হরতাল আহবানকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউই ছেলেটির জানাজায় পর্যন্ত গিয়ে শরীক হননি!
কেনো?
একটি জীবনের দাম কি এতই কম?

বললে বোধ’য় অত্যুক্তি হবে না বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি এবং কওমী মাদরাসা একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অভিন্ন সাবজেক্ট। একটির গায়ে আচড় লাগলে ব্যথা অনুভূত হয় অন্যটির শরীরে। হবারই কথা। এদেশে ইসলামী রাজনীতির মূল উপকরণ ধরা হয় কওমী মাদরাসার ছাত্রদের।

ইসলামী সংগঠনের আলেম নেতারা সভা ডাকলে পোস্টারিং মাইকিং এর কাজগুলো তো এদেরই করতে হয়। হরতাল টাইপ আন্দোলনের ডাক দিলে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পুলিশের কাঁদানো গ্যাস ও লাঠিপেটা খেয়ে আন্দোলন সফল করবার জন্য মাঠে তো নামতে হয় এই কওমী মাদরাসা ছাত্রদেরই। এরা হলো রিজার্ভ ফোর্স।

এত ব্যবহার করি আমরা ছেলেগুলোকে, অথচ তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ভিশন সেট করতে চাই না। কখনো কি ভেবে দেখেছি এই ছাত্রগুলোর  প্রতি আমরা সুবিচার করতে পারছি কি না!

মুফতি আমিনি সাহেবের ডাকে সারা দেশে হরতাল পালিত হলো। যদিও দেশের সকল শীর্ষ আলেম-উলামা হরতাল সমর্থন জানাননি। কিন্তু  রাজপথে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র! দলমতের উর্ধে উঠে আলেম-উলামা এবং কওমী মাদরাসা ছাত্ররা নেমে এসেছিলেন মাঠে।
কেনো?
আমিনি সাহেবের সম্মানে?
মুফতি আমিনিকে সফল নেতা বানানোর জন্যে?
মোটেও না।
কেনো তবে??
কারণ, উলামায়ে কেরামের বর্তমান অবস্থান ও প্রশ্নবিদ্ধ আগামী আরো যাতে ছন্নছাড়া হয়ে না যায়, মানুষ যাতে মনে না করে, আলেমদের হরতাল  ব্যর্থ হয়েছে, আলেমরা ব্যর্থ হয়েছেন, শুধু এই কারণেই ।

আমার প্রশ্ন অন্য জাগায়। নেতাদের কাছে আমাদের জানতে চাওয়া খুবই সামান্য,
গতকালের হরতালে শত শত ছাত্র আহত হয়েছে। এদের চিকিৎসার ভার কে নেবে?
শতাধীক গ্রেফতার হলো। এদের ছাড়িয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেয়া হলো? দায়ছাড়া ছন্নছাড়া নেতৃত্ব দিলে তো হবেনা। 
হরতাল ডাকবেন, ছাত্ররা আহত হবে, চিকিৎসার দায় নেবেন না! তাহলে তো হবে না!

ছেলেরা জেলে যাবে, ছাড়িয়ে আনতে চেষ্টা করবেন না! ঠিক যেভাবে হরতালের আগের দিন মুক্তাগাছা থেকে ৬ জন মাদরাসা ছাত্রকে গ্রেফতার করে সারাদিন আটকে রাখা হলো। কোনো নেতা সারাদিন তাদেরকে ছাড়িয়ে আনতে যাননি! ছাড়াতে যাবেন তো পরের কথা। সারাদিন ছেলেগুলোর জন্য  এক বোতল পানি পর্যন্ত পাঠাননি!! 
এমন হলে তো হবে না!


 অবস্থা যদি এমন হয়, আর তারপরেও ভাবেন,  এই ছেলেরা ইসলামী হুকুমত কায়েমের জন্য আজীবন মাঠে থাকবে!! আপনাদের পেছনে পেছনে জিন্দাবাদের স্লোগান দিয়ে দিয়ে মাঠ কাঁপাবে!
তাহলে এই ধারণা ব্যুমেরাং হতে খুব বেশি দিন লাগবে বলে তো মনে হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন