রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০১১

তোমার শূন্যতা...

  বায়তুল মোকাররাম জাতীয় মসজিদের মরহুম খতিব মাওলানা উবায়দুল হক রাহ.’র
আত্মার প্রতি নিবেদিত খোলাচিঠি
তোমার শূন্যতা
প্রিয় পূণ্যত্মা। সালাম জানাই। আশা নয়, বিশ্বাস, শান্তিতেই আছেন। থাকবারই কথা। পূণ্যতার সিঁড়ি ভেঙেছেন, জীবনভর, পূর্ণতার চূড়ায় আরোহণ করবেন বলে। যার জন্য ছিলো অস্তিত্ব, জীবনের সূর্যোদয়, শরত-হেমন্ত, সুখ-আনন্দ, কষ্ট-জরা এবং বেঁচে থাকা, তার তুষ্টিতে রাত করেছেন দিন, এশা থেকে ফজর, ফজর থেকে এশা। আজ তাঁকে কাছে পেয়েছেন। অথবা কাছে গেছেন বিশেষ মেহমান হয়ে। ভালো যে থাকবেনই, না বোঝার কী আছে?
প্রিয় খতিব!
আপনাকে লিখছি কেনো?
আল্লাহর পথে যারা জীবন উৎসর্গ করেন, তাদেরকে মৃত বলতে হয়না। যেমন আপনি। বিশেষ জীবনে আছেন। যে জীবনের রুলস্-রেজুলেশন একটু ভিন্ন। জানি আমরা, আপনি এখন আর নিজের অর্জনকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু প্রিয়জনদের জন্য অনেক কিছুর তদবির করতে পারবেন। এই সুযোগটি আমরা নিতে চাই। আমরা আপনার প্রিয় তালিকায় পড়ি কিনা- জানি না। হয়তো পড়ি! হয়তো পড়িনা। অবস্থা যেমনই হোক, আজ আমি আমার কথাগুলো আপনাকে বলবোই। এই দৃঢ়তায়, পরম করুণাময় বিশেষ ব্যবস্থায় সেটা আপনার কাছে পৌঁছে দেবেন। তারপর হয়তো তিনিই আবার আপনাকে মর্টিভেট করবেন আমাদের হয়ে তাঁর কাছে চাইতে।
প্রিয় খতিব!
জানতে চাইবেন না আমরা কেমন আছি? কেমন আছেন আপনার সহকর্মী আলেম-উলামা? কেমন আছে আপনার বায়তুল মোর্কারাম? আপনার প্রিয় দেশবাসী?
আমরা ভালো নেই খতিব। মোটেও ভালো নেই আমরা। এ জন্য দায়ী কিন্তু নিজেরাই। আমাদের অহমিকা, একঘেয়েপনা, একদর্শিতা, আত্মবিকৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। সবগুলো বলতে শুরু করলে এতো শান্তির ঠিকানায় থেকেও কষ্ট পাবেন আপনি। আপনার বুকের বামপাশে, হার্ট যেখানটায় আছে, ঠিক তার  নিচেই অনুভব করবেন চিনচিন ব্যথা! তবুও শুনুন! কিছুকথা আপনার শোনা দরকার। আপনার বায়তুল মোকাররাম আজ আর আলেমদের হাতে নেই। যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আপনি খুতবা দিতেন, সেখানে আজ আসন পেতেছেন একজন প্রফেসর! জনশ্র“তি আছে এই ভদ্রলোকের আবার মসজিদ থেকে মাজারের দিকেই বেশি আকর্ষণ।
আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না খতিব। যে বস্তুটিকে আমরা এখন খতিব বানিয়ে বায়তুল মোকাররাম আলোকিত করবার দায়িত্ব দিয়েছি, তার ভেতর-বাইর কতো বেশি অন্ধকার! কুরবানীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কোথাকার কেউ একজন চ্যালেঞ্জ করে বসলো আদালতে। খতিব হিসেবে জানতে চাওয়া হলো তার কাছে। তিনি বললেন, খতিয়ে দেখবো! ক্লাস ফাইভের একটি বাচ্চাও যে মাসআ’লাটি জানে, খতিব সাহেব সেটা খতিয়ে বের করবেন। চিন্তা করেন অবস্থা?
এই ভদ্রলোকের কথা কী বলবো। ফিতরার পরিমাণ জিজ্ঞেস করলে সোজা সেঞ্চুরী করে বসেন। ঈদের নামাজ পড়ান ফিফটি পার্সেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ফিফটি পারসেন্ট মানে ডিজিটালের ডিজি বাদ দিয়ে আর কি!
ডিজিটাল বলেতে গিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজির কথা চলে আসে। এই লোকের কাহিনী আপনার না শোনাই ভালো। আমি যখন বলবো এই লোক ফাউন্ডেশনের ইমাম সম্মেলনে ব্যালে ড্যান্স করান, তখন আপনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, ব্যালে ড্যান্স! সেটা আবার কী?
আমাকে বলতে হবে, এটা আমেরিকান মেয়েদের নৃত্য।
তখন আপনি রাগত কন্ঠে জানতে চাইবেন, এই লোককে ফাউন্ডেশন থেকে তাড়ানোর প্রক্রিয়াটি কতটা অপমানজনকভাবে হয়েছে? তখন মাথা নিচু করে বলতে হবে, ডিজি এখনো আছেন বহাল তবিয়তে।  আমরা কিছুই করতে পারিনি! তারচে’ এটা আপনার না শোনাই ভালো।
এমন গুণধর ব্যক্তিদের আমরা বায়তুল মোকাররামে ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে হজম করে চলেছি খতিব। কেউ কিছু বলছি না। না আমজনতা, না আলেম-উলামা। লোক দেখানো প্রতিবাদ অবশ্য হয়েছে। সেটা না হওয়ার মতোই। আলেম-উলামারা দু’একটি বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রসব করে হালকা হয়ে গেছেন।  ভেবেছেন আমাদের আর কী করার আছে। আল্লাহপাকের কাছে নিশ্চয়ই আর জবাবদিহি করতে হবে না!
 আচ্ছা খতিব, বাংলাদেশের আলেম-উলামারা আল্লাহকে বোকা ভাবেন কিনা-এমনটি ভাবলে আমার কি  কোনো গোনাহ হবে? বোকাই যদি না ভাবতেন, তাহলে সামান্য প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করে কেমন করে ভাবেন দায়িত্ব পালন করা হয়েগেছে। বোধগুলো আমাদের মরেগেছে খতিব। আমরা বেঁচে আছি নির্বোধ জড়পদার্থের মতো। আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন না। ক্ষমা পাবার কোনো অধিকারই আমাদের নেই।
    প্রিয় খতিব!
    বায়তুল মোকাররাম, আমরা জানি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাবে সাথে এ কথাও জানি, দেশের প্রায় আড়াই লক্ষ মসজিদের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে এই বায়তুল মোকাররাম। বিশ্বাস করুন খতিব, বায়তুল মোকাররাম আজ অন্ধকার হয়ে আছে! শত শত বাল্ব জ্বালিয়েও এই অন্ধকার দূর করা যাচ্ছে না। বায়তুল মোকাররামের মতো মসজিদের মিম্বরে যদি থাকেন মেরুদন্ডহীন কেউ, তাহলে অবস্থা যা হবার, তাই হয়। হচ্ছেও।
    জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে দেশের ১৪ কোটি মুসলমানের হৃদয়ের কথাই উচ্চারিত হবার কথা। কুরআন-সুন্নাহ’র বিরুদ্ধে কোনো কিছু হলে প্রতিবাদের প্রথম আওয়াজটি ওখান থেকেই আসার কথা। আজ যখন সরকার, বুঝে হোক আর না বুঝে, সেচ্ছায় হোক আর বিদেশি মুরব্বিদের চাপে, কুরআনের নির্দেশনার বিপরীতে আইন করে  ফেলতে যাচ্ছে, বায়তুল মোকাররাম তখন নির্বিকার! আমাদের খতিব সাহেব মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। অবস্থা  দেখে মনে হচ্ছে বোমা মারলেও তার পেট থেকে এ ব্যাপারে কোনো কথা বের হবেনা!
    প্রিয় খতিব!
    কী করে পারতেন? বায়তুল মোকাররামের খতিব যুগ্মসচিব পদ-মর্যাদার সরকারি কর্মকর্তার ক্যাটাগরিতে পড়েন। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আপনি ছিলেন ব্যতিক্রম। যে কোনো সরকার কুরআন বিরোধী পদক্ষেপ নিতে চাইলে প্রথম হুংকারটি আপনিই দিয়েছেন। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মিম্বর থেকে নেমে এসেছেন পল্টনে। কী করে পারতেন? এই পবিত্র মনোবল কোথা থেকে পেতেন আপনি?
    প্রিয় খতিব!
    আজ আপনাকে মনে পড়ছে । খুব মনে পড়ছে। আজ ঠের পাচ্ছি আপনার শূণ্যতা! আপনি যখন ছিলেন, বুঝতে পারিনি কী ছিলেন। আজ  নেই যখন, বুঝতে পারছি কী হারিয়েছি।
    আপনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, আমার দেশের ‘নেতা বেশি কর্মী কম’ টাইপ ইসলামী সংগঠনগুলোর অতি অভিজ্ঞ আলেম-উলামারা আপনাকে খুব একটা মূল্যায়ন করতে রাজি হননি।  নিজেরা শুকনো রুটিতে অভ্যস্ত কিন্তু পরের ঘি’তে কাটা বাছতে আমাদের জুড়ি নেই কোনো। আপনি ছিলেন এদেশের আলেম সমাজের আস্থার জায়গা, নির্ভরতার প্রতীক, অবচেতন মানসিকতার নির্ভার মনোবল, অনেক আলেম-উলামাদের কাছেই সেটা ছিলো অজানা! আপনার ব্যক্তিত্ব ও ইমেজকে ব্যবহার করে সফলতার মুখ দেখেছেন আলেমরা। কিন্তু মুখে সেটা স্বীকার করার উদারতা দেখাতে পারেননি।  

এদেশে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পরিচালিত সরব আন্দোলনগুলোর  পেছনে আপনি ছিলেন নিরব উৎসাহদাতা। যখন দরকার ছিলোনা, পেছনে থেকে সাহস যুগিয়েছেন। যখন দরকার হয়েছে, সামনে এসে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি থেকেছেন মূল মঞ্চের বাইরে। সেখানে থেকেই যা যা করা দরকার করেছেন। আপনার নিরব সমর্থনই যে অন্যান্য লাখো কন্ঠের স্লোগানেরচে’ ছিলো শক্তিশালী, এটা যারা বোঝার, তারা ঠিকই বুঝতো। অনেকেই বুঝতেন না। জানি আজও তারা আমার সাথে একমত হতে চাইবেন না। তাতে কি! আমরা তো জানি কে কী! কার দৌড় কতটুকু।
    আমরা ব্যর্থ হয়েছি খতিব। আপনার অবর্তমানে আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্র্থ হয়েছি। আমরা আমাদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করছি। মুসলিম জাতির জাতীয় ইস্যুতেও আমরা পারিনি দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধে উঠতে। এখনো আমাদের অনেকগুলো ব্যানার। অনেকগুলো মাইক্রোফোন। দেশের মানুষ উলামাদের হাতে হাত রাখতে চায়। ঐক্যবদ্ধ হাতে। সুযোগ পায়না। কী যে হবে!
প্রিয় খতিব!
শুরুতে বলেছিলাম পরম করুণাময়ের কাছে আমাদের হয়ে সুপারিশ করতে। আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ’র কাছে আমাদের হয়ে ক্ষমা চাইবার দরকার নেই। আপনিও আমাদের ক্ষমা করবেন না। আমাদের শাস্তি দরকার। তা না হলে আমাদের হুশ ঠিকানায় আসবে  কেমন করে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন