সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১০

অসুস্থ কলম, আক্রান্ত জাতি ...সুবিধাবাদী লেখক এবং বোবা শয়তানের গল্প

তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের উপরে উঠার অংকটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু তৈলাক্ত কলমের কথা অনেকেই জানি না। জানা দরকার। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে পারার জন্য এটা জানা জরুরী। একটি কলমের ক্ষমতা অনেক। একটি তরবারীর ক্ষমতাও কম না। অনেক রাজ্য জয় করেছে তরবারী। কিন্তু আমরা কি জানি সেই উন্মুক্ত তরবারীগুলোর চালকের রক্তে উষ্ণতা তৈরি করার আসল কাজটি কিন্তু কলমই করেছে। তবে তরবারী ও কলম, দু'টোর মাঝে পার্থক্য আছে। তরবারীর আঘাতে লাল রং বেরোয়। কলমের আঘাতে বেরোয় কালো। তরবারীর রং বেরোয় ধ্বংস করার জন্য। কলমের কালো নূতন কিছু সৃষ্টি করে। কলম স্বপ্ন দেখায়, তরবারী স্বপ্নের জগতে গিয়ে হানা দেয়। সবমিলিয়ে বলা যায় একটি কলমের ক্ষমতা অনেক। ইস্পাতের সামান্য একটি তরবারীর’চে তো অবশ্যই বেশি। এত ক্ষমতাবান একটি কলম যাদের রয়েছে, তাদের নাম লেখক। ইংরেজি Author। আজ আমরা লেখকদের গল্প করবো।
¬¬ প্রাইমারী লেবেলের ছোট্ট কোনো বন্ধু যদি এই মুহুর্তের পাঠক হয়, তাহলে তার জন্য জানিয়ে রাখি। ইংরেজি Writer এবং Author দু'টোর বাংলাই লেখক। তবে পার্থক্য আছে। কলম হাতে নিয়ে সাদা কাগজে যে কোনো কিছু লিখলেই তাকে Writer অর্থে লেখক বলা যাবে। যেমনDid writer বা দলিল লেখক। Type writer বা টাইপ মেশিনে লেখক। এমনকি যারা পরীক্ষার খাতা লেখে, মামলার এফআইআর লেখে, দোকানের জমাÑখরচ লেখে, ক্রিকেট খেলার স্কোর লেখে, রেষ্টুরেন্টের বিল লেখে, রাইটার অর্থে তারাও লেখক। তবে আমাদের সমাজে আমরা যাদের লেখক বলি, অর্থাৎ যাদের লেখা আমরা আগ্রহ নিয়ে পড়ি, আনন্দের কিছু পেলে দাঁত ফাঁক করে হাসি, কষ্টের কথায় হাÑহুতাশ করি, অর্থাৎ যারা গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখেন, পত্রিকায় ফিচার লেখেন, সাবজেক্টিভ বই-কিতাব লেখেন, এক কথায় যাদের লেখার মূল হলো Creative faculty সেই লেখকরা কিন্তু Writer না। তারা হলেনAuthor।
একজন লেখকের ক্ষমতা অনেক। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রকে ওলট-পালট করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে একজন লেখকের কলমের। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের উপস্থিতি ছিলো ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে। নজরুল অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন নি। করেছেন কলম হাতে। “লাথি মার ভাঙ্রে তালা, যত সব বন্দিশালা আগুন জ্বালা...” কবিতাগুলো থেকে যে গোলাবারুদ বের হতো, সেটা এ.কে ৪৭ রাইফেলেরচে কোনো অংশেই কম ছিলো না। যুদ্ধবাজ, জুলুমবাজ, আধিপাত্যবাদী গোষ্ঠী, সকল যুগের, অস্ত্রের’চে কলমকেই ভয় করেছে বেশি। ৪৭ পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকরা তাদের জন্য অন্যতম হুমকী হিসিবে চিহ্নিত করেছিলো মাওলানা আবুল কালাম আযাদের কলমকে। তাঁকে জেলে পুরেও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি তারা। পাহারাদার রাখা হয়েছিলো যাতে তাঁর কলমটি গর্জে উঠতে না পারে। আজও কলমকে নিস্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে বলে গোঠা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রন করছে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র।
দুই.
একজন লেখকের সুবিধা, অসুবিধা এবং বে-সুবিধা, তিন দিকই আছে। সুবিধাবাদী লেখকদের কথা জানতে হলে প্রথমে এগুলো জানা দরকার। বেসুবিধা শব্দটি যাদের খট্কায় ফেলে দিয়েছে, তাদের জন্য বলি। বাংলা ব্যাকরণে এই শব্দটির প্রয়োজন আছে। অন্তত আমি আমার জীবনে সেটার উপস্থিতি ঠের পেয়েছি।
লেখকের সুবিধা হচ্ছে, মনের কথা সময় নিয়ে গুছিয়ে বলতে পারেন। মনের ঈশানে জমে থাকা কালো মেঘগুলো নিরবে বসে বের করে দিয়ে হালকা হতে পারেন। লেখকের সবচে’ বড় সুবিধা হল তারা স্বপ্ন দেখতে পারেন। পারেন স্বপ্ন দেখাতেও । বর্তমানে বসে ভবিষ্যতের বেলকনিতে চলে যেতে পারেন স্বপ্নের হাতধরে। পাঠককেও নিয়ে যেতে পারেন সেখানে।
লেখকের অসুবিধার শেষ নেই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে একজন লেখকের প্রথম পছন্দ, প্রথম প্রাপ্য। অন্যের অধিকারে বা অনুভূতিতে আঘাত না করে স্বাধীনভাবে লিখতে পারার সুযোগ থাকা উচিৎ একজন লেখকের। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা কী দেখি? মত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু কিতাবেই আছে। বাস্তবে নেই। কথা বলতে হয় মেপে মেপে। পরিবেশ-পরস্থিতি ওজন করে। রাষ্ট্রীয় হর্তাকর্তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলার আগে সম্ভাব্য সকল প্রকার ঝুঁকির আশংকা মাথায় রাখতে হয়। আমার দেশের কর্তাব্যক্তিরা ভিন্নমত হজম করে অব্যস্ত না। তাদের পছন্দ তোষামোদ। দ্বীনি কোনো মাসআ’লা নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা জাগলে মাথায় রাখতে হয় বুযুর্গানে দ্বীনের মখ্তলিফ্ নযরিয়্যাতের বিষয়টিও। লেখকের অন্যতম আরেকটি অসুবিধা হল ক্ষেত্র সংকট। লেখা প্রকাশের পরিধি সংকট। একজন নবীন লেখক, অসম্ভব প্রতিভা রয়েছে তার। সে সেটাকে খুব বেশিদিন লালন করতে পারছে না। প্রথম কারণ, পরিচর্যা পাচ্ছে না। দ্বিতীয় কারণ, বিকশিত হওয়ার জায়গা ও সুযোগ পাচ্ছে না।
সুবিধা অর্থ সহজ উপায়। উপায় যদি সহজ না হয়ে একটু কঠিন হয়, তাহলে তার নাম অসুবিধা। আর উপায়টি যদি হয় ঝুঁকিপূর্ণ, আশংকাজনক, তাহলে সেটাকে তো অসুবিধা বলে হালকা করে দেখা যাবে না। তাহলে কী বলবেন? আমি এর নাম দিলাম বেসুবিধা। বেসুবিধার উদাহরণ দিচ্ছি? দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তনয় জয় এবং জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক এলাহির বিরুদ্ধে পেট্রোবাংলা থেকে উঠানো দূর্নীতির অভিযোগের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিলো। যার রির্পোটার বা লেখক ছিলেন পত্রিকাটির সিনিয়ার সাংবাদিক মোঃ আব্দুল্লাহ। প্রতিবেদনটি লেখার কারণে তার উপর সন্ত্রাসী হামলা হলো। ফেনীর একসময়ের দাপুটে আওয়ামীলীগ নেতা জয়নাল হাজারীর ষ্টিয়ারিং কমিটি সাংবাদিক টিপুর পা ভেঙে দিয়েছিলো। এগুলোকে কী বলবেন? বেসুবিধা না বলে উপায় আছে?
বেসুবিধার আরেকটি উদাহরণ দিই। কেউ অন্যভাবে নেবে না। ভাববেন না নিজেকে আমি লেখক হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছি। বিনয় নয়, বাস্তবিক অর্থেই এখনো আমি সাহিত্যের দন্ত্য-স এর ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছি। বানানরীতি, মাত্রা জ্ঞান, গদ্যের ছন্দ, ভাবের সাথে বাক্যের তাল, উপস্থাপনের সাবলিলতা ইত্যাদি এখনো আয়ত্বে আনা হয় নি। এগুলো ঠিকমত জানা হলে তবেই না শব্দের সাঁকো তৈরি করবো, যে সাঁকো দিয়ে পার হবে কালের কলিরা। সময়ের হাত ধরে এগিয়ে যাবে সময়। গিয়ে মিশে যাবে আবার সময়ের সাথে। সাথে থাকবে শুদ্ধির মিছিল। আগে আমাকে এগুলো জানতে হবে। মানতে হবে। তবেই না লেখক। তার আগে লেখালেখি শুরু করলে ঝামেলা আছে। শারীরিক আঘাত আসুক বা না-ই আসুক, মানসিক টর্চার আসবেই। এসেছে আমার উপরও। ঠুঁট কাটা কিছু রূঢ় কথা লিখে ফেলেছিলাম বলে কোনো এক সময় কম তিরস্কৃত হতে হয়নি আমাকে। এরচে বেশি আর কিছু বলতে চাই না। পানিতে কুপ মারতে চাই না, হাটুতো নিজেরই।
তিন.
লেখালেখি চার প্রকারের হতে পারে বলেই আমার ধারনা।
(১) স্রোতের অনুকূলে
(২) স্রোতের প্রতিকূলে
(৩) গতানুগতিক
(৪) বাস্তবকেন্দ্রিক।
স্রোতের প্রতিকূলে বুক চিত্রে দাঁড়িয়ে যারা লিখে যেতে পারেন, তাদের অন্য নাম বিদ্রোহী লেখক। স্রোতের অনুকূলে কলম ভাসিয়ে দিলে তাদের নাম হয় সুবিধাবাদী লেখক। এ ধরনের লেখকের লেখার অপর নাম তেল মারা। কোনো কিছুর চিন্তা বা তোয়াক্কা না করে যা সত্য, যা বিবেকসিদ্ধ, যা বাস্তব, তাই লিখে যাওয়ার নাম বাস্তবকেন্দ্রিক লেখা। আর সবগুলোর দরমিয়ানী রাস্তা এখতিয়ার করে লিখলে সেটা হয় গতানুগতিক লেখা। আমার পর্যবেক্ষণ ও শ্রেণী বিন্যাস ভুলও হতে পারে। বিশ্বাস করতে হবে এমনও কোনো কথা নেই। আমি আমার কথা বললাম। গতানুগতিক লেখকদের উদাহরণ দেয়া হয় নি। দু’টি উদাহরণ দিচ্ছি। আলেম লেখকদের জন্য একটা। গায়রে আলেম সাধারণ লেখকদের জন্য একটা।
আলেম লেখকদের ম্যাক্সিমামই যে কোনো ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্ব, ফজিলত, তাৎপর্য ও আহম্মিয়তের বর্ণনা নির্ভর লেখালেখিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ওসব বিষয়ে খত্রা নেই। কিন্তু যে কোনো সরকার দ্বীনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে সে বিষয়ে তাদের কলম নিরবতা পালন করাকেই নিরাপদ মনে করে। তাঁরা এবাদত নির্ভর বিষয়াদি নিয়ে লিখে লিখে বিরাট পুস্তক তৈরি করে ফেলেন কিন্তু শরয়ী আহকামাত, মুনকারাত এবং স্পর্শকাতর হক্ক কথা তাদের আর লেখা হয় না। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, মাওলানা আকরম খা, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, কবি ফররুখ, নজরুল, এই নামগুলো হারিয়ে গেছে তাদের মনতশির জেহেন থেকে!
গায়রে আলেম লেখকদের মধ্যে সুবিধাবাদী লেখকদের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। সময়ের নাজুকতা থাকে তাদের নখদপর্নে। স্রোতের অনুকূলেই চলে তাদের কলম। এরা হয় পরজীবি প্রকৃতির। এরা হয় ককুর স্বভাবী। হাড়ের জন্য লেখে। মাড়ের জন্য লেখে। হাড় এবং মাড় পেলে তাদের পক্ষে যে কোনো কিছুই লেখা সম্ভব। তাদের কোনো সমস্যা হয় না কারণ, বিবেক বলে কোনো বস্তু তাদের এক’শ হাতের ভেতরে এসে ঢুকতে পারে না। এরা হচ্ছে অতি নিম্নমানের জঘন্য রুচির সুবিধাবাদী লেখক। সুবিধাবাদী লেখকের আরো একটি গ্র“প আছে। এরা মূলত হাড় আর মাড়ের জন্য লেখে না। তবে তারা অসম্ভব প্রকৃতির ভীতূ। ভীতূর ডিমে বসে তারা তা দেয়। তাদের তলানীতে কিছু বিবেকও আছে। সেই বিবেকের মুখে থাকে স্লাইডিং দরজা। যে দরজা ধাক্কা দিয়ে একদিক থেকে অন্যদিকে সরানো যায়। সময় বুঝে তারা তাদের বিবেকের দরজাকে এদিক-উদিক করে। অবস্থা সুবিধার না হলে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরা তখন হয়ে যায় বোবা শয়তান। যে সত্য না বলে চুপ থাকে, তাকে বলা হয় বোবা শয়তান, আরবীতে আখ্রস শয়তান। শায়তানুন আখ্রাসুন। আর যদি লিখেও কিছু, সেটা হয় জ্বী হুজুর টাইপ। অবিকল মানুষের মত দেখতে এই প্রাণীগুলো সাপের মত মেরুদন্ডহীন। এরা সত্য বলে না, সত্য বুঝে না, সত্য দেখে না। এরা চতুস্পদ জন্তুরচে’ও নিকৃষ্ট। এই বিশেষন আমি দিচ্ছি না। দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক...“তাদের অন্তর আছে কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু চোখ দিয়ে দেখতে চায় না, তাদের কানও আছে কিন্তু শুনতে চায় না। এরা চারপায়ী জন্তুর মত, বরং তারচেও নিকৃষ্ট।” সুতরাং বিবেককে কাজে লাগিয়ে যে লেখক লিখবেন না, বা লেখা থেকে বিরত থাকবেন, তাদের বিশেষন দৃ’টি। যার যেটা পছন্দ, গ্রহণ করতে পারেন।
(১) চতুস্পদ জন্তু
(২) বোবা শয়তান।
চার.
সুবিধাবাদী লেখক সকল পর্যায়েই আছেন। আমার ঔদ্ধত্ব ক্ষমা করা হলে আমি বলবো আলেম লেখকদের মধ্যেও এই সংখ্যা নেহায়ত কম না। কোনো না কোনো ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা থাকলে তার চোখে এক ধরনের পর্দা পড়ে যায়। কুরআনের ভাষায় যাকে বলা যায় গিশাওয়াহ্। তখন আর নিজ দলের দুর্বলতা লেখক মহোদয়ের চোখে পড়ে না। তাঁর রাজনৈতিক মুরব্বীদের মুখ থেকে কোনো ভুল কথা উচ্চারিত হলেও তিনি এক’শ একটা যুক্তি খাড়া করে প্রমাণ করতে চাইবেন এরচে খাঁটি কোনো বাণী আল্লাহর জমীনে এর আগে আর কেউ দেন নি! অই সকল রাজনৈতিক দলের বসন্তবাদী লেখকরা ভুলেও খুঁজে দেখেন না ইসলামী রাজনীতির পহেলা নাম্বার শর্ত খুলুসিয়্যাত ও লিল্যাহিয়্যাত তাদের সংগঠনে আছে কি না! থাকলে দেখা যাচ্ছেনা কেন? না থাকলে নেই কেন? অই লেখকরা তাদের আলেম নেতার সামনে প্রয়োজনে নতজানু হয়েও জিজ্ঞেস করেন না, ঐক্য তাদের এতবেশি অপছন্দের জিনিষ কেন?
সাধারণ সুবিধাবাদী লেখকদের সবচে বেশি পরিচয় আমরা পেয়েছি গত তিন উদ্দিনের সরকারের সময়ে। আই.এম.এফ বা ইয়াজুদ্দিন, মইনুদ্দিন, ফখরুদ্দিন এর আমলে আমরা দেখেছি সুবিধাবাদ কাহাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কী কী? দেশের নামি দামি লেখকরা হাটুগালা দিয়ে শুরু করেছিলেন অই সরকারের স্তুতি ও স্থাবকতা। ট্রিপল উদ্দিনের সরকারকে মোটামুটি ফেরেশতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে রীতিমত বন্দনায় মেতে উঠেছিলেন তারা। প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন কে কত বেশি হাসিনাÑখালেদা বিরোধী বক্তব্য তুলে ধরে সেই সরকারের নেক নজর কাড়তে পারেন।
সময় পাল্টে গেছে। সুবিধাবাদী অই লেখকরাও খোলস পাল্টে ফেলেছেন। যে দুই নেত্রীকে তাদের লেখায় প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের সকল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু এবং গণতন্ত্রের দুশমন, তাদেরকেই এখন আবার ব্যাখ্যা করছেন গণতন্ত্রের ক্যাপসুল হিসেবে। ভাবখানা এমন যে, এই দুই নেত্রীই গণতন্ত্রের দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটিকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে জং ধরা ইঞ্জিনটি সার্ভিসিং করে সচল করে তুলেছেন। জাতিকে এ জন্য কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে দুই নেত্রীকে কুর্নিশ করা দরকার। এমন লেখকদের চিহ্নিত করে রাখা প্রয়োজন। জাতির জন্য এরা এক ধরনের হুমকি। সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্য পাপ এরা।
পাঁচ. বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে নাস্তিকতাকে প্রগতির সমার্থক শব্দ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। যেন নাস্তিক বা তার কাছাকাছি যেতে না পারলে প্রগতিশীল লেখক হওয়া যাবে না! প্রগতির ঠিকাদার সেজে রাজধানীতে বসে যারা হাম্কে-তুম্কে করেন, তারা সংখ্যায় খুব কম তবে প্রভাবশালী। নাস্তিকতাকে মাপকাটি বানিয়েই তারা লেখার ভালমন্দ গুণাগুন বিচার করেন তবে তাদের অনেকেই নিজেকে নাস্তিক বলে প্রকাশ করেন না। বলার আর অপেক্ষা রাখেনা যে, কোনো সরকারের মাথায় ইসলাম বিদ্বেষের পোকা ঢুকিয়ে দেয়াই তাদের আসল কাজ। এই কাজটি না করলে তাদের পেটের ভাত হজম হয় না।
বাংলাদেশে আরো কিছু লেখক আছেন যারা ফেরাউন স্বভাবী। ফেরাউনের নীতিতে বিশ্বাসী। কথাটি ব্যাখ্যা করছি। তার আগে আরো কিছু কথা জেনে নেয়া দরকার। আমাদের সমাজে কিছু লেখক আছেন, যারা নাস্তিক তো নন, তবে নিজের ধর্ম বিশ্বাস প্রকাশ করতে কুন্ঠাবোধ করেন। পাছে না আবার প্রগতির গায়ে দাগ লেগে যায়, এই ভয়ে। আমার মনে পড়ছে দেশের জনপ্রিয় একজন ঔপন্যাসিককে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “আপনি কি আস্তিক?” ক্রিকেটের বাউন্সার থেকে গা বাঁচানোর মত করে সু-কৌশলে জবাব এড়িয়ে গেলেন তিনি। বললেন, “বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।” কিছু লেখক আছেন যারা বৎসরে দুই ঈদের নামাজে হাজির হন। এই অর্থে তারা আল্লাহ বিশ্বাসী। কিন্তু তারা তাদের লেখালেখিতে আল্লাহ শব্দটি উচ্চারণ করেন না? তারা বলেন ঈশ্বর!
এবার ফেরাউন স্বভাবীদের কথা বলি। ফেরাউন আস্তিক ছিলো না নাস্তিকও ছিলো না। সে ছিলো সস্তিক(!)। সস্তিক শব্দটি উৎপাদন করা হলো। স্রষ্টায় বিশ্বাসী হলে আস্তিক। না হলে নাস্তিক। কিন্তু নিজেকেই স্রষ্টা দাবি করলে তার জন্য কোনো না কোনো শব্দতো লাগবেই। সস্তিক শব্দটি আমার কাছে মন্দ মনে হয় নি। তো ফেরাউন নিজেকেই খোদা বলে দাবি করতো। তাও যেন-তেন খোদা না, সবচে’ বড় খোদা। যদিও সেও জানতো, সত্যিকারের আল্লাহ একজন ঠিকই আছেন। তবে প্রকাশ করতো না। কিন্তু কথায় আছে না, সাপ গর্তে ঢুকে সোজা হয়ে। ফেরাউনও গর্তে ঢোকার সময় সোজা হতে চেয়েছিলো। ঈমান আনতে চেয়েছিলো আল্লাহর উপর। সুযোগ দেয়া হয় নি। আমাদের দেশের ফেরাউন স্বভাবী লেখকরাও বয়স হয়েগেলে সুর নরম করে ফেলেন। ধীরে ধীরে যখন এগিয়ে চলেন বার্ধক্যের অন্ধকার সরু গলির পথ ধরে, তখন মৃত্যুর ভয় তাদের কাবু করে ফেলে। তখন খোদাদ্রোহী প্রগতির ভাঙ্গা রেকর্ড আর বাজান না। এমনকি তখন তাদের অনেককে নামাজ রোযার দিকে বিশেষ নজর দিতেও দেখা যায়। প্রয়াত লেখক, ড. হুমায়ুন আজাদের মত স্বঘোষিত নাস্তিক লোকেরও পাশে বসে তার মেয়েকে আমরা সুরায়ে ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে দেখেছি। জানাযাও হয়েছে যথারীতি।
ছয়.
আমাদের দেশে বেশ ওজনদার লেখক আছেন কিছু। যারা লিখনে আচরণে যাই হোন, নামটি তাদের ইসলামী। মা বাবার দেয়া মুসলমান নামটি আর পরিবর্তন করেন নি। তবে ইসলাম শব্দটি থেকেই গুনে গুনে একশ হাত দূরে থাকতে চেষ্টা করেন। তাদেরকে কিন্তু নাস্তিক লেখক বলা যাবে না। কেউ আল্লাহ বিশ্বাস না করলেও, খোদাদ্রোহী কথাবার্তা বললেও, তাকে আর যা-ই বলা যাক, নাস্তিক বলা যায় না। নাস্তিক অই ব্যক্তিকেই বলা যাবে, যে স্রষ্টা বলে কারো অস্তিত্বেই বিশ্বাসী না। দাউদ হায়দার, হুমায়ূন আজাদ, ড. আহমদ শরীফ, তসলিমা নাসরিনরা নাস্তিক ছিলেন কারণ, তারা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। তারা ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। এছাড়া ইসলাম ও ধর্মীয় ব্যাপারে উল্টা-পাল্টা বললেই বা লিখলেই তাকে নাস্তিক বলা যাবে না।
পাঠক বিভ্রান্ত হবেন না। ভাববেন না আমি তাদের ডিফেন্স করার চেষ্টা করছি। মোটেও না। আবেগের জগতের বাইরে এসে যা সত্য, তাই তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। যে যা, তাকে তো তাই বলা দরকার। বাড়িয়ে বলার তো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া আমড়াকে জোর করে জলপাই বানানোর জন্য টানা-হেছড়া করারইবা দরকার কী? আমড়াও তো আর কম টক না। আমি যাদের কথা বলছি যে, তারা নাস্তিক না, তাহলে তারা কী? ধোয়া তুলসীর পাতা? খাঁটি দ্বীনদার ?
মাফ করবেন। আমি সেটা বলি নি। তাদেরও খাঁটি দ্বীনদার হতে কোনো আগ্রহ নেই। তারা কথা কাজ ও লেখনিতে সরাসরি ইসলামের প্রতিপক্ষ। আলেম-উলামা, মাদরাসা ও ইসলামের বিরুদ্ধে বলা ও লেখা তাদের মূল কাজ। নিজেদের নাক কেটে হলেও ইসলামের যাত্রাপথে কাটা বিছাতে তারা বিকৃত ধরনের আনন্দ পান। তারা তাদের এই আনন্দ একে অপরের সাথে শেয়ার করেন। চমৎকার একটি ইউনিটি কাজ করে তাদের মধ্যে। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের কেউ একজন কোনো কথা লিখলে বাকীরা সেটা পড়ে দেখার আগেই সেটাকে সাপোর্ট করে হারমোনিয়ামে একই সুর তুলেন। বলেন, ‘তথাস্তু।’
তথাস্তু’র ব্যাখ্যা কি পাঠকের জানা আছে? জানা না থাকলে আপনার আশেপাশে থাকা কোনো হিন্দু লোকের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে নিয়েন। সংক্ষেপ ঘটনা হলো, আমাদের হিন্দু ভাইজানরা যখন কোনো বিপদÑআপদে পড়েন, বা তাদের কোনো কিছুর দরকার হয়, তখন তারা তাদের ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন। ভগবান তো আর এত অবসর থাকেন না। তিনি থাকেন মহাব্যস্ত। সমস্ত জগত দেখাশুনা করে রাখা তো কম কথা নয়। উপাসকের বিস্তারিত শুনার সময় থাকে না ভগবানের হাতে। তাই যেভাবে চাওয়া হয়, সেভাবেই তিনি কবুল করে নেন। তিনি শুধু বলেন ‘তথান্তু’। এর মানে, ‘তাই হোক।’ ব্যস, প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েগেলো।
বাম ধারার এই লেখকরাও চোখ বন্ধ করে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে থাকেন। আর একে অপরকে সমর্থন জানান ‘তথাস্তু’ কায়দায়। আমি বাম ধারার যে লেখকদের নাম নিলাম, আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতে যদিও তারা নাস্তিক এর সংজ্ঞায় পড়েন না, কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধাচরণে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া (বিষক্রিয়াও পড়া যাবে) সৃষ্টিতে তারা নাস্তিকদের চাইতে কম খতরনাক নন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফেরদেরচে’ মুনাফিকরাই ইসলামের ক্ষতি করেছিলো বেশি। কারণ, ‘ঘরের শত্র“ বিভীষন।’
সাত. দুই মাতাল সন্ধ্যেবেলা তর্ক করছিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে একজন বলছিলো, এটা সূর্য। অন্যজন দাবি করছিলো এটা বড় কোনো তারকা হবে। হঠাৎ সামনে এসেপড়া তৃতীয় এক লোককে তারা টলতে টলতে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা ভাই, বলেন তো আকাশে ওঠা কী? সূর্য না তারকা?
লোকটি জবাব দিলো, ‘মাফ করবেন ভাই, আমি এই এলাকায় নতুন এসেছি!’
জবাব জানা আছে। জানা না থাকলে একটু খোঁজাখুঁজি করলেই জবাব পাওয়া যাবে। তারপরও যদি জবাব আসে প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে, গা বাঁচিয়ে, তাহলে তো হলো না। প্রশ্ন যেভাবে আসবে, জবাব দিতে লাগবে সেভাবেই। কোনো ইসলাম বিদ্ধেষী লেখক, ফুল নাস্তিক বা হাফ নাস্তিক, ইসলাম ও কুরআনের বিরুদ্ধে কিছু লিখে ফেললো। আর তার ফাসি চাই’ র মিছিল দিয়ে মাঠ গরম করে তোলা হলো, এই নীতি কিন্তু পারফেক্ট না। কেউ মুখে বললে মুখে জবাব দিতে লাগবে। লিখে বললে লিখে। জবাব জানা না থাকলে জেনে নিতে হবে। এ পর্যন্ত এদেশে যারাই ইসলাম ও কুরআনের বিরুদ্ধে লেখার দুঃসাহস ও দৃষ্টতা দেখিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ‘ফাসি চাই দিতে হবে’ বলে চিৎকার করে করে গলাভাঙ্গা ছাড়া আর তো কিছুই করা হতে দেখলাম না! তাদের যুক্তির জবাবে যুক্তি খাড়া করে প্রপার ওয়েতে জবাব লিখতে দেখলাম না কাউকে! কেন? যোগ্য লোকের অভাব? নাকি বোঝার অভাব? না পরিকল্পনার? বিষ ঢালা হচ্ছে গাছের গোড়ায়, ডালে ধরে ঝাঁকা ঝাঁকি করে লাভ কী?
চলুন, আমরা সকলে মিলে শুরু করি সুস্থ ধারার লেখকের খোঁজ করা। তাদের খুঁজে বের করি। তাদের নেতত্বে খুলে বসি লেখক তৈরির একটি পাঠশালা। আমরা সেখানে ভর্তি হই। প্রতিভা আছে, ক্ষমতা আছে, যোগ্যতা আছে কিছু লেখার, এমন সবাইকে সেখানে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিই। আগামী প্রজন্মকে কালচারাল বিপর্যয় ও বুদ্ধিভিত্তিক দেউলিয়াপনা থেকে রক্ষা করার জন্য এই কাজটি করা বড় বেশি জরুরী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন