শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০১০

দিন যায় কথা থাকে

 

       ভাগ্যিস তারা বাংলা বুঝেন না। তা নাহলে সম্ভবত সংসদের অধিবেশন চলা অবস্থায়ই আমাদের মুখে থু থু ছিটিয়ে বেরিয়ে আসা উচি্ত কিনা-বিবেচনা করতেন। আমি কমনওয়েলথ প্রতিনিধি দলের কথাই বলছি। বড়বেশি আগ্রহ ও কৌতূহল নিয়ে তারা গিয়ে বসেছিলেন আমাদের সংসদ গ্যালারীতে। উদ্দেশ্য, আমাদের সংসদীয় কার্যাবলী পর্যবেক্ষণ করা। আর বেছে বেছে সেই দিনটিকেই আমরা আলাদা করলাম ছূড়ান্ত নোংরামীটা করবার জন্য। 
উনিশ’শ নব্বই সালে গণতন্ত্র পূন:প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে আজ অবদি আমাদের সংসদ কখনো জাতির আশা-আকাংখার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের সংসদ সদস্যরা তাদেরই তৈরি রুলস অব প্রসিডিউরকে কোনো কালেই পাত্তা দেননি। যার যেমন ইচ্ছে, তেমনই বক্তৃতা করেন সংসদে। ফ্রি স্টাইল বক্তৃতা। প্রসঙ্গ যত অরুচিকরই হোক, বাক্য মত নোংরাই হোক, তাদের মুখে কিছুই আটকায় না। আর যখন যিনিই স্পীকারের আসনে বসা থাকেন, তিনি থাকেন অসহায়। বাজে মন্তব্য করার কারণে কাউকে তিনি ভর্তসনা করতে বা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করেও দিতে পারেন না। সেই ক্ষমতা তাকে আমরা দেইনি। আজকের প্রেক্ষাপটে স্পীকারের হাতে সেই ক্ষমতা দেয়া উচি্ত কিনা, ভেবে দেখা যেতে পারে। অবশ্য তার আগে যা ভেবে দেখা যেতে পারে, তা হলো, দলীয় টিকেটে নির্বাচিত এমপিদের মধ্য হতে স্পীকার নির্বাচন করার বিকল্প কোনো উপায় খুঁজে বের করা যায় কি না। 
দুই \
        কয়েক বছর আগে তিন দিনের জন্য তাবলীগে গিয়েছিলাম। সাত/আটজন বন্ধু-বান্ধবসহ। আমীর সাহেব বললেন, “ভাই আমরা আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছি। আমরা একে অন্যের কাছে সওয়াল তো করবোই না, এমনকি সওয়ালের ভান্ও ধরবো না।” রাতে খেতে বসেছি। আমার সাথী (বন্ধু) আমাদের প্লেট থেকে মাছের টুকরো নিয়ে গেলো। বললাম, কিরে! আমীর সাহেবের কথা তোর মনে নেই? সে বললো, “খুব মনে আছে। আমীর সাহেব চাইতে নিষেধ করেছেন, জোর করে নিয়ে যেতে তো আর নিষেধ করেন নি!”
      আমাদের সংসদীয় রীতি হচ্ছে সংসদে কেউ মিথ্যে বললে সেটাকে মিথ্যে বলা যাবেনা। সংসদের আদবের বরখেলাফ হবে। বলতে হবে অসত্য। এমন কারো ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করা যাবেনা, সংসদে এসে যার আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ নেই। আমরা লক্ষ্য করে থাকি আমাদের কিছু কিছু সংসদ সদস্যদের অবস্থা আমার অই বন্ধুটির মতো। তারা একজন অন্যজনকে মিথ্যেবাদী বলেন না, তবে চুর-ডাকাত সন্ত্রাসী বলেন ঠিকই। এমন ব্যক্তিবর্গ নিয়ে নোংরা মন্তব্য করেন, এই জীবনে যাদের সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করার ক্ষমতা নেই। কবর থেকে উঠে সংসদে এসে জবাব দেয়ার ক্ষমতা কারো থাকে না। বিটিভি ওয়ার্ল্ডের সৌজন্যে এদেশের খেটেখাওয়া মানুষ সংসদ অধিবেশন দেখে থাকে। আর আমাদের মাননীয় সাংসদগণ যখন স্বরূপে আবর্তিত হন, তারা যখন মৃত নেতাদের কবর থেকে টেনে-হেঁছড়ে বের করে আনার চেষ্টা করেন, তারা যখন জীবিত নেতাদের কুতসিত ভাষায় গালি দেন, নেত্রীদের শাড়ীর আঁচল ধরে টানাটানি করেন, তখন সেটা দেখে দেশের সাধারণ জনগণ লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেয় টেলিভিশনের পর্দা থেকে। আর মনে মনে ভাবে, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে গালাগালি করার দরকার কী? কোনো বস্তির পাশে খোলা আসমানের নিচেই তো এই কর্মটি করা যায়।
তিন \
          দীর্ঘ ৬৩ কার্যদিবসে অনুপস্থিত থাকার কৃতিত্ব দেখানোর পর বিএনপি সংসদে যোগদান করেছে। আমরা দেশবাসী আশাবাদী হয়েছি। একটি প্রাণবন্ত ও কার্যকর সংসদ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি। আমরা ভেবেছি সংসদে আমাদের জাতীয় সমস্যাগুলো আলোচিত হবে। আমরা আশাহত হলাম। গত নির্বাচনের পরে সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন “বর্তমান সংসদটা কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। এই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জাতি কতটুকু কী পাবে, বলা মুশকিল।” আর অতি সম্প্রতি দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও কলামিষ্ট জনাব এবিএম মুসা বলেছেন, “বর্তমান সংসদের ৮০% সাংসদই অযোগ্য।” দেশের দল নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবিরা আমাদের সংসদ সদস্যদের সুস্থ মানসিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। তোলারই কথা। আমরা হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করছি আমাদের এমপি মহোদয়গণ কে কাকে কত জঘন্য গালি দিতে পারেন, কে কার থেকে নোংরা শব্দ ব্যবহার করতে পারেন, সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন। তারা ভেবে দেখেন না সংসদ কারো বাবার টাকায় পরিচালিত হয় না। সংসদ পরিচালিত হয় এদেশের খেটেখাওয়া মানুষের ঘাম ঝরানো টাকায়। তারা ভেবে দেখেন না এদেশের অনেক মানুষ রিক্সা চড়ায় সামর্থ রাখেনা কিন্তু তাদেরকে দিয়েছে ডিউটি ফ্রি গাড়ি। সংসদে নিয়ে গরীবের কথা বলবার জন্য। এই গাড়ি হাঁকিয়ে সংসদে গিয়ে খিস্থিখেউড় করবার জন্য নয়।
      সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধীদলকে বলা হয় ছায়া সরকার। বিরোধীদলের গঠনমূলক সমালোচনাকে আমলে নিয়েই দেশ পরিচালনা করবে সরকার। এটাই নিয়ম। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? সাপ আর নেউলও মাঝে-মধ্যে একত্র হয় কিন্তু আমাদের সরকার ও বিরোধী দল কখনো এক হয় না। দেশ নয়, দলই তাদের কাছে মূখ্য। এক এগারোর সুনামীর পরে আমরা আশা করেছিলাম আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের খাসলতের পরিবর্তন হবে। আমাদের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করবার জন্য তারা এক বছরের বেশি সময় নিলেন না। পুরোনো কায়দায় যোদ্ধাংদেহি মনোভাব নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন পরস্পরের বিরুদ্ধে। সংসদের ভিতরে/বাইরে।
     শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়ার কারণে হোক, প্রবল জনচাপে হোক আর আসন রক্ষার খাতিরেই হোক, দীর্ঘ বর্জনের পর বিএনপি জোটের সংসদে যোগদানকে জাতি ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতে লাগলো। জাতি আশা করলো সংসদ এবার প্রাণবন্ত হবে। কিন্তু বিএনপির যোগদানের পরপরই ট্রেজারী বেঞ্চের বক্তব্যে মনে হলো তারা ঠিক চাইছেন না বিএনপি সংসদে থাকুন। বিএনপি অধিবেশনে যোগ দেবার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যা নিয়ে ৩০০ বিধিতে একটি বিবৃতি দিলেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দিতেই পারেন। যদিও তার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ ছাত্র আবু বকরের মৃত্যুতে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে বিবৃতি পেলাম না। উপরন্তু বলে বসলেন “এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা হতে পারে!” আমরা মনে করি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন মন্তব্য করতেই পারেন। তিনি তো আর মা  নন। আবু বকরের মৃত্যুতে তার মায়ের বুকে কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে, সেটা আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনোদিনই বুঝতে পারবেন না। সন্তান পেটে ধরলে এবং বকরের মায়ের মত খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে লালন-পালন করে বড় করলে তবেই না বুঝতেন সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কত তীব্র! আর সবাই আবু বকরকে নির্দোষ বললেও একটা দোষ কিন্তু তার ঠিকই ছিলো। আর সেটা হলো, সে রাজনীতি করতো না। 
      ৩০০ বিধির অই বিবৃতিতে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন, তাতে মনে হলো সংসদে নয়, পল্টনে বক্তৃতা করছেন তিনি। তা-ও সরকারের নয়, বিরোধীদলে থেকে! তিনি তার বক্তৃতায় সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনলেন জিয়াউর রহমানের নাম। খুনি বললেন জিয়াকে। বললেন, হত্যার রাজনীতি শুরু করেছিলো খুনি জিয়া ও মুশতাক। বোধগম্য কারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জিয়াকে খুনি বলার অংশটি এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানায়। স্পীকার মহোদয় সেটা না করায় তারা ওয়াক আউট করে। অবশ্য পরের কার্য দিবসেই আবার ফিরে আসে সংসদে। এসে দাবি জানাতে থাকে আপত্তিকর অই অংশটি এক্সপাঞ্জ করার জন্য। তখন সেই বিতর্কের আগুনে অহেতুক ঘি ঢেলে পরিবেশকে আরো বেশি উত্তপ্ত করে তুলেন মন্ত্রিত্বের পদবঞ্চিত আওয়ামীলীগের এমপি শেখ সেলিম। তিনি বলেন, জিয়ার কবরে জিয়ার লাশ নেই। প্রয়োজনে ডিএনএ টেষ্টেরও দাবি জানান তিনি। তীব্র প্রতিবাদ করে, ফাইল ছুড়ে, গালাগালি ও হট্টগোল করে সংসদ থেকে বেরিয়ে আসে বিএনপি। কিন্তু পরের দিন অধিবেশনে যোগদান করে তারাও শুরু করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য। ‘তুমি অধম হইলেও আমি উত্তম হইবো না কেন’, এই শিক্ষাটুকু আমাদের সম্মানিত এমপি হযরাতগণকে কেউ কখনো দেয়নি। বিএনপি’র সাংসদ সৈয়দা পাপিয়া আশরাফী ও শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন বঙ্গবন্ধুকে। তারা বলেন, ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো। সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা হয়েছিলো। সুতরাং শেখ মুজিবও খুনি। তারপরে সংসদের অবস্থা আর বর্ণনা না করলেও চলে। কমনওয়েলথ সদস্যরা চেয়ে চেয়ে দেখলেন আমাদের মহান সংসদ সদস্যরা কত বেশি নিচে নামতে পারেন। উপস্থিত সময়ে বাংলা না জানার কারণে কথাবার্তা কোন পর্যায়ে হচ্ছে, বুঝতে না পারলেও পরের দিন ইংরেজি দৈনিকগুলো থেকে তারা বুঝতে পারেন সবকিছু। আর তখন তাদের মনে আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতি নিয়ে যে ধারণা তৈরি হবার কথা, জাতি হিসেবে সেটা নিশ্চয় গৌরবের নয়। 
চার \
     প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, “ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়”। জুনিয়ার এমপিরা সিনিয়ারদের কাছ থেকে ভাল কিছু শিখতে আগ্রহী না হলেও মন্দটুকু ঠিকই শিখে নেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিয়ার মাজারে জিয়ার লাশ আছে কি নেই, জাতীয় সংসদে সেই সংশয় প্রকাশ করার পর সেটাতে লবণ মরিচ মাখিয়ে আরো মুখরোচক করে তুলে ধরলেন শেখ সেলিম। তিনি আরো এক চামচ এগিয়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে আহ্বান জানালেন ডিএনএ টেষ্টের জন্য। জানিনা আগামীতে আমাদের সবাইকে জন্ম পরিচয়ের গ্যারান্টিপত্র হিসেবে পকেটে করে ডিএনএ সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরতে হবে কিনা! আমাদের এই সংসদে এমন অদ্ভুত কোনো আইন পাশ করা হলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দকে আমাদের বড়বেশি জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, জিয়ার কবরে লাশ থাকা না থাকার সাথে ডিজিটাল বাংলাদেশের বা জাতির স্বার্থের কী সম্পর্ক থাকতে পারে আমরা বুঝতে পারছিনা। দয়া করে বলবেন? লাশ থাকুক আর নাই থাকুক, আপনাদের কী আসে যায়? জিয়া অনুসারীরা জিয়ার কবরে ফুল দিচ্ছে, জিয়ারত করছে। আপনাদেরকে তো আর বলছে না আসুন, ফুল দিন। তবে কেন অহেতুক এই টানা হেঁচড়া? জিয়াকে নিয়ে কথা বললে কি বঙ্গবন্ধু অক্ষত থাকেন? থেকেছেন? প্রত্তোত্তরে কি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটাক্য করা হয়নি? টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে কি বিএনপি থেকে কথা উঠেনি? বিএনপি নেতা আ স ম হান্নান শাহ যখন বলেন “পঁচাত্তরে আমি ছিলাম আর্মি অফিসার। ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর লাশ সহ অনেকগুলো লাশ কফিনে ছিলো। কোন্ কফিনে কোন্ লাশ ছিলো অথবা বঙ্গবন্ধুর কবরে যে কফিনটি রাখা হয়েছিলো, সেই কফিনে বঙ্গবন্ধুরই লাশ ছিল কিনা, সংশয়ের অবকাশ রয়েছে...” তখন এর দায় কার! প্রকারান্তরে কি আওয়ামীলীগই দায়ী নয়? জিয়ার লাশ নিয়ে কথা না বললে কি টুঙ্গিপাড়া নিয়ে কথা উঠতো? 
পাঁচ
          কয়েকদিন আগেই এক বক্তব্যে আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বেগম খালেদা জিয়াকে বলেছেন ‘অমানুষ’। সংসদে বিএনপি থেকে যখন অভিযোগ করে বলা হয়, “৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত এদেশের মায়েরা তাদের যুবতী মেয়েদের নিয়ে রাতে ঘুমোতে পারতো না, তখন জবাবে আওয়ামীলীগের এক সাংসদ খালেদা জিয়া সম্বন্ধে যে নোংরা কথাগুলো বলেন, সেটা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে না। সৈয়দ আশরাফের ‘অমানুষ’ থিওরীতে উদ্বুদ্ধ হয়েই কি-না জানিনা, অই এম.পি বললেন, ৭২-৭৫ মধ্যবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়াও তো যুবতী ছিলেন। অই সময়ে তিনি যখন রাতে জিয়াউর রহমানের সাথে বিছানায় যেতেন...?” তিনি আরো বলেন, “চারিত্রিক সমস্যার কারণে জিয়াউর রহমান খালেদা জিয়াকে তালাক দিতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন জিয়াকে বুঝিয়ে সুজিয়ে সংসার টিকিয়ে দিয়েছিলেন...।” এই হলো আমাদের সাংসদদের সংসদীয় ভাষা! আমাদের দুর্ভাগ্য, এমন মানসিকতার মানুষকে আমরা ভোট দিয়েছি! তারা আমাদের জন্য আইন তৈরি করবেন! দোষ তো আমাদেরও আছে। এমন অসভ্যতা ও নোংরামী যখন জাতীয় সংসদের প্রদর্শিত হয়, তখন বড়বেশি অসহায় মনে হয় স্পীকারকে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থায় বিব্রত ভঙ্গিতে তাকাতে থাকেন তিনি। তাঁর করার কিছু থাকে না। এই অবস্থায় সংসদে যদি কোনো সংসদ সদস্য অসভ্য ও নোংরা কিছু উচ্চারণ করেন, আর আল্লাহপাকের খাস কুদরতে সংগে সংগেই তার মুখ সেলাই হয়ে যায়, তবেই বন্ধ হতে পারে এই অসুস্থ প্রবণতা। এছাড়া আমি আর কোনো উপায় দেখছি না। 
ছয় \
       বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি। জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। (হাইকোর্টের রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি। ঘোষণা তো জিয়া ঠিকই দিয়েছেন, অবশ্য সেটা প্রথম ঘোষণা ছিল কিনা সেটা বলতে পারবেন তখন যারা ছিলেন, তারা)। তুলনামূলক বিশ্লেষণে না গিয়েই আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই দুই নেতাইতো মহান। বঙ্গবন্ধু থেকে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে কোনো ত্র“টি বিচ্যুতি হয়ে থাকলে সে জন্য যেমন স্বাধীনতার মূল কারিগর হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অবমূলায়ন করা যাবে না, ঠিক তেমনি হাইকোর্ট থেকে ৫ম সংশোধনী বাতিল হলেও, জিয়ার শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করা হলেও একাত্তরে জিয়ার অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আর কোনো শাসনামল অবৈধ হলেও তখনকার সবগুলো কাজ অবৈধ হয়ে যায় না। এই কথাটি মেনে না নিলে আওয়ামীলীগের জন্যই মুশকিল হয়ে যাবে। ২০০৬-০৮ এই দুই বছর ছিলো একটি অবৈধ ও অসাংবিধানিক সরকার। এখন সেই অবৈধ সরকারের সবকাজকে যদি অবৈধ ঘোষণা দেয়া হয়, তাহলে তাদের অধিনে নির্বাচনেরও বৈধতা থাকবে না। আর তাহলে এই সরকারের বৈধতা নিয়াই সংশয় দেখা দেবে।
আওয়ামীলীগ জিয়াকে খুনি বলার পর বিএনপি খুনি বলেছে বঙ্গবন্ধুকে। এর মানে কি আওয়ামীলীগেরই বঙ্গবন্ধুকে খুনি বলা হলো না? আওয়ামীলীগ থেকে জিয়ার কবরে লাশ আছে কি নেই, প্রশ্ন তোলার পর বিএনপি থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে টুঙ্গিপাড়া সম্পর্কে। এর মানে কি বঙ্গবন্ধুকে আওয়ামীলীগই খাটো করলো না? 
সাত \
        বঙ্গবন্ধু এবং জিয়া, দু’জনেই আমাদের জাতীয় নেতা। আমি দু’জনের মধ্যে কম্পেয়ার করছি না। দেশের জন্য কার কী অবদান, সেটা দেশবাসী জানে। আসল কথা হলো, এই দুই নেতাকে বাদ দিয়ে তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুরুই করা যাবে না। আমরা জানি জীবিত বঙ্গবন্ধুর প্রতি জিয়ার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং জীবিত জিয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর স্নেহ কম ছিল না। আজ তারা কবরে চলে যাওয়ার পর তাদেরকে গালাগালি করেই নিবৃত্ত হচ্ছেন না তারা, তাদের লাশ নিয়ে পর্যন্ত টানা হেঁচড়া শুরু করে দিয়েছেন। আমি বঙ্গবন্ধুর হয়ে আওয়ামীলীগকে এবং শহীদ জিয়ার পক্ষ থেকে বিএনপিকে ধীক্কার জানাই। 
আমরা আশা করতে চাই আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সভ্যতার জয় হবে। আমাদের সংসদ সদস্যরা যে কোনো কথা উচ্চারণ করার আগে মনে রাখবেন তারা রেল লাইনের বস্তিতে নয়, জাতীয় সংসদে কথা বলছেন। তারা মনে রাখবেন, দিন যায়, কথা থাকে। তারা মনে রাখবেন চার বছর পর আবার তাদের ফিরে আসতে হবে জনগণের দরজায়। তখন জনগণ যদি তাদেরকে বলে, জনাব গালাগালি করবার জন্য কষ্ট করে আপনার সংসদে যাওয়ার দরকার নেই। এই কাজ বাইরেই সারেন। আর গত ৫ বছরে সংসদে ফালতু কথাবার্তা ও নোংরামি করে কতটাকা খরচ করেছেন, হিসাব দিন। তখন তাদের জবাবটা কী হবে, আমার জানার বড়ই কৌতূহল। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন