শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১১

গণতন্ত্র , গোড়ায় গলদ কি না?

ব্যাপারটি নিয়ে ভাবছি বেশ কিছুদিন হলো। সমাধান খুঁজে পাচ্ছিনা। কারো সাথে শেয়ারও করতে পারছিনা। পাছে না আবার ভাবে, পাগল! আদার খুচরো দোকানদার, জাহাজ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে! পরে ভাবলাম যা আছে কপালে। জাতির সাথেই শেয়ার করি। দু’পাঁচ জনের কাছে পাগল সেজে লাভ নেই। পাগল বললে পুরো জাতি পাগল বলুক। জাতীয় পাগল হতে পারাও মন্দ হবে না।

বর্তমান বিশ্বে সবচে’ সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রনীতি হচ্ছে গণতন্ত্র। আমাদের দেশেও। যদিও এদেশে গণতন্ত্রের পোশাক পরে রাজতন্ত্রের অশরীরি আত্মাগুলোকেই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, তবুও। 

যদিও আমাদের গণতন্ত্রের থলের ভেতরেই ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখা যায় উর্দি শাসনকে স্বাগত জানানোর পাইক-পেয়াদাদের, তুবও। 

আমরা ভাবতে ভালোবাসি, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। যদিও এদেশের রাস্তা-ঘাটে, গ্রাম-শহরে, অফিস-আদালতে, এমনকি জাতীয় সংসদেও, অবলা গণতন্ত্রকে ধর্ষিত হতে দেখা যায়। গণতন্ত্রের কোমল বুকে ছুরি বসিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে মসনদ হাসিল করার ঘটনাও ঘটে। তবুও। 

আমরা সেই গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করি। যে গণতন্ত্রের বুকে পা রেখে উপরে উঠা যায়। সেই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি আমরা, যে গণতন্ত্র আমাদের পৌঁছে দিতে পারে ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে। আমরা গণতন্ত্রের প্রতি ততক্ষণ আস্থাশীল থাকতে পারি, যতক্ষণ আমার স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে বাধা হয়ে দাড়ায় না।

গণতন্ত্র মানে হচ্ছে, জনগণের জন্য জনগণের মনোনিত জনগণের সরকার। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জনগণ যাকে চাইবে, যাদেরকে চাইবে, তারাই করবে সরকার গঠন। তারাই চালাবে রাষ্ট্র। কিন্তু কথা হচ্ছে দেশের সকল মানুষের চাওয়া তো আর সমান হয়না। কেউ চায় অমুককে তো কেউ চায় তমুককে। কেউ ভোট দেয় আম গাছকে তো কেউ আবার তাল গাছকে। এ জন্য ব্যাপারটির নিষ্পত্তি করা হয়েছে এভাবে,

কোনো আসনের অধিকাংশ মানুষ যাকে ভোট দেবে, তিনিই হবেন নির্বাচিত। আরবীতেও একটা মূলনীতি আছে, আল আকসারু হুকমুল কুল। অধিকাংশের মতামতকে সকলের মতামত হিসেবে গণ্য করে নেয়া যেতে পারে। অনেকটা এভাবেই।

এ ধারাই অনুসৃত হয়ে আসছে বিশ্বব্যাপী। স্থানীয় নির্বাচন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত। কোনো নির্বাচনী এলাকায় অধিকাংশ মানুষ যাকে সমর্থন জানাচ্ছে, তিনিই পাচ্ছেন নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের খেদমত (!) করবার সুযোগ। আর আমার প্রশ্ন এখানেই। আমার খটকার জায়গাটিই এটি। আমার বোঝার ভুলও হতে পারে। কেউ হয়তো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করবেন। সমস্যাটির ব্যাখ্যা আছে আমার কাছে। সমাধান নিয়ে ভাবা হয়নি। কেউ হয়তো ভাববেন। কিংবা কে জানে অন্য কোনো সূত্রে বিষয়টি মীমাংসিতই আছে কিনা। জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবো আমি। আর এই সাথে জানিয়ে রাখি, গণতন্ত্রের ফজিলত বর্ণনা করা বা পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করার জন্য এই লেখা নয়। বিষয়টি হচ্ছে গণতন্ত্রের কেতাবী সংজ্ঞা এবং প্রায়োগিক বাস্তবতার মাঝে মিল-অমিল সংক্রান্ত।

বুঝতে পারছিনা কীভাবে প্রকাশ করবো। গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর মূল কথা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পছন্দ ও সমর্থনের ভিত্তিতেই জন-প্রতিনিধি বা সরকার গঠিত হবে। কিন্তু একটু সুক্ষ্মভাবে কালকুলেশনে গেলে দেখা যায় এর ব্যতিক্রম হয়েও সরকার গঠিত হতে পারে। আর হচ্ছেও। তাও আবার গণতান্ত্রিকভাবেই। দেখা গেলো, অধিকাংশ মানুষ কাউকে বা কোনো দলকে পছন্দ করলো না, সমর্থন জানালো না, তারা চাইলোনা এরা নির্বাচিত হোক বা সরকার গঠন করুক। কিন্তু গণতন্ত্রের দেয়ালের ঠিক মধ্যেখানে থাকা বেশ বড় একটি ছিদ্র দিয়ে তাদেরও সুযোগ হয়ে উঠছে নির্বাচিত হবার বা সরকার গঠনের। আর এমনটি অহরহই হচ্ছে। উদাহরণ দিচ্ছি।

মনে করা যাক, কোনো আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন ৫ জন। ভোট কাস্ট হলো ৮০%। ধরে নেয়া যাক হিসাবটা দাঁড়ালো এভাবে, যিনি নির্বাচিত হলেন, তিনি পেলেন ৯০ হাজার ভোট। ২য় অবস্থানে থাকা প্রার্থী পেলেন ৮০ হাজার। ৩য় জন ৪০ হাজার। বাকী দু’জন পেলেন ৩০ হাজার ভোট। এলাকার ২০% বা ৬০ হাজার লোক ভোট দেয়নি অর্থাৎ কাউকেই সমর্থন জানায়নি।

এবারে অবস্থা দাঁড়ালো এই যে, মিস্টার এক্স ৯০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে গেলেন। এর মানে তার এলাকার ৯০ হাজার মানুষ সমর্থন জানালো তাকে। তারা চাইলো মিস্টার এক্স এমপি হোন। কিন্তু পরাজিত ৪ প্রার্থী মিলে পেয়েছিলেন ৮০ হাজার যোগ ৪০ হাজার যোগ ৩০ হাজার সমান ১ লক্ষ ৫০ হাজার ভোট। এর মানে এই দেড় লক্ষ মানুষ মিস্টার এক্সকে চাইল না। তারা চেয়েছে তার বিকল্প। আর তাদের এই চাওয়াটা খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়াতে সুযোগটা পেয়ে যান মিস্টার এক্স। ফলাফল দাঁড়ালো, ৯০ হাজার মানুষের পছন্দ এবং দেড় লক্ষ মানুষের অপছন্দকে পুঁজি করে গণতন্ত্রের ছিদ্র দিয়ে তিনিই হয়ে গেলেন নির্বাচিত! গণতন্ত্রের মূল কথাটি আবারো সামনে নিয়ে আসা যাক। জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন অধিকাংশের সমর্থনের ভিত্তিতে। অথচ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অধিকাংশ মানুষ যাকে চায়নি, তিনিই হয়ে যাচ্ছেন নির্বাচিত। ব্যাপারটি কেমন হয়ে গেলো না?

পূর্বোল্লিখিত সম্ভাবনা এবং অনেকটা বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে যে ছকটি দাঁড়ায়, তা হচ্ছে, দেখা গেলো কোনো দল প্রদত্ত ভোটের ৪৫% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার গঠন করে ফেললো। সেটা হলো একটা গণতান্ত্রিক সরকার।

অথচ সরকারকে ভোট দেয়নি- এমন মানুষের সংখ্যা ৫৫%। তাহলে কেমন করে বলা যায় গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় দেশের অধিকাংশ মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয়ে থাকে? ব্যাপারটির কোনো সহজ সমাধান আপাতত সামনে নেই আমার। চিন্তাজীবি যারা, তাদের কাছে থাকলেও থাকতে পারে।

অতি সম্প্রতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে একটি ফর্মুলা প্রস্তাব করেছেন। বলেছেন, নির্বাচন হবে দলীয় ভিত্তিতে। অর্থাৎ, মানুষ বিশেষ কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেনা। ভোট দেবে নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল ইত্যাদি মার্কাকে অর্থাৎ দলকে। যে দল সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পাবে, তারাই করবে সরকার গঠন। প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে স্ব স্ব দল প্রার্থী মনোনিত করে তাদের জীবনের আমলনামাসহ নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। নির্বাচন কমিশন মনোনিত ব্যক্তিকে সার্বিক বিবেচনায় যোগ্য মনে করলে তবেই তাকে ঘোষণা করা হবে নির্বাচিত হিসেবে।

এরশাদ সাহেবের এই ফর্মূলার পক্ষে বিপক্ষে দুদিকেই যুক্তি আছে। ফর্মূলাটি গ্রহণ করে নেয়া হলে কালোটাকার মালিকরা টাকার বিনিময়ে ভোট কিনে এমপি হবার সুযোগ পাবেন না। পেশি শক্তির কিংবদন্তিরা জোর করে কেন্দ্রদখল করে এবং গায়ের জোরে জিতে আসার সুযোগ পাবেন না। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের অধিকাংশ মানুষ যাদের চাইবে তারাই করবে সরকার গঠন। কারণ সামনে থাকবে প্রাপ্ত ভোটের সর্বমোটের আনুপাতিক পরিসংখ্যান। আবার এর দুর্বল দিকও আছে। এতে কার দলের প্রধান ও প্রভাবশালী অংশের সেচ্ছাচারিতা ও দৌরাত্ব লাগামহীন হয়ে যেতে পারে। তাদের ভাই-বেরাদার, ভাগ্নে-মামা তথা আত্মীয়-স্বজনদের ভারে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে সংসদ। যেহেতু মাঠ পর্যায়ে পয়সা খরচ করতে হচ্ছেনা, সে জন্যে কোঠি টাকার নমিনেশন বাণিজ্যের স্থলে মনোনয়ন বাণিজ্যের টাকার অংক চলে যেতে পারে শত কোটিতে। সেই সঙ্গে সংসদ ভরে যেতে পারে অযোগ্যদের দ্বারা।

গণতন্ত্রের যে দুর্বল দিকটির কথা আমি উল্লেখ করলাম, জানি না সেটা আসলেই দুর্বলতা কিনা! হয়ে থাকলে এর সমাধান কী?

মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল, ২০১১

পান্তা ইলিশ, বাঙালি


 আরো একটি পহেলা বোশেখকে স্বাগত জানাবো বলে আমরা প্রস্তুত। প্রতি বছরই একবার করে  এ প্রস্তুতি আমরা নিই। বাংলা সন তারিখের জন্মদাতা মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন আকবরের শুরু করা দিন গণনা’র এই আয়োজনে মেতে উঠি আমরা ভয়াবহ রকমে। পহেলা বোশেখের ভোরে লালপাড় সাদাশাড়ি এবং পা’জামা পাঞ্জাবি পরে আমরা, অতি আধুনিক বাঙালিরা সমবেত কন্ঠে কোরাস তুলি-

<em>এসো হে বৈশাখ এসো এসো।
কিছুক্ষণের জন্য পাশে বসো...</em>

আমি দু:খিত, দ্বিতীয় লাইনটি আমার বানানো। অটা সুর করে গাওয়া হয় না। লাইনটির ধারণা কোথ্যেকে পেলাম, সেটা বলি।

যখন এই চরণগুলো গাওয়া হয়, তখন অবচেতন মনের অবস্থা থাকে এমন, এসো হে বৈশাখ এসো এসো। সারাদিন থাকো আমাদের সাথে। খাতির-যত্নের কমতি হবে না। সন্ধ্যেবেলা আবার চলে যাও! আমরাও ফিরে যাবো আমাদের অতি প্রিয় পশ্চিমা সংস্কৃতিতে। তোমাকে দিয়ে আমাদের পোষাবে না। কেনো বুঝতে পারছো না যুগ পাল্টেছে। একুশের এই আমরা মেতে থাকবো জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারি নিয়ে। তবে বছরে একবার তোমাকে ঠিকই স্মরণ করবো। চিন্তা করো না।

তুমি কিছু মনে করোনা প্রিয় বৈশাখ। তুমি তো আমাদের আপনজন। তোমাকে আমরা আমাদের চেতনার বন্ধ কুটিরে যত্ন করেই রাখবো। সযত্নে তুলে রাখবো আমাদের অস্তিত্বের পাণ্ডুলিপিতে।

 এক সময়, কোনো এক সময় আগামী প্রজন্মের কৌতূহলি কেউ জমে থাকা ধূলো-ময়লা ঝেড়ে বের করবে পাণ্ডুলিপিটি। ততক্ষণে আমরা হারিয়ে যাবো কালের গহীনে। সেখান থেকে দেখবো, চেতনার বৈশাখকে তারা বাস্তবতার বৈশাখে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। সে পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষায় থাকতে হবে প্রিয়। আমাদের ক্ষমা করো। বুঝতেই পারছো সব কাজ সকলের দ্বারা হয় না।

দুই

বৈশাখকে কেন্দ্রকরেই আমাদের সংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতি। অথবা বাংলাদেশি। আচ্ছা আমরা কি বাঙালি? নাকি বাংলাদেশি? নাকি দু’টোই?

বাঙালি হই আমরা, কিংবা বাংলাদেশি, কী আসে যায়! আমাদের হাড্ডিসার শরীরে বাঙালির পোশাক পরানো হোক অথবা বাংলাদেশির, যেমন আছি তেমনই তো থাকতে লাগবে। অনেকটা লোহার মতো। লোহাকে যত বড় হাতুড়ি দিয়েই পেটানো হোক, লোহা লোহাই থাকে, স্বর্ণ হয়ে যায় না।

আমাদের অবস্থাও তাই। ৫ বছর আমাদের ঘাড়ে পড়বে বাঙালি হাতুড়ির বাড়ি, পরের ৫ বছর বাংলাদেশি হাতুড়ির। যে হাতুড়ির মাথায় লাগানো থাকে হরতাল,অসহযোগ,জ্বালাও, পোড়াও কিংবা ঘেরাও। আমরা জ্বলতে থাকি। আমরা পুড়তে থাকি। হাতুড়ির আঘাত আমরা সহ্য করতে থাকি। সহ্য আমাদের করতেই হয়। চিৎকার করে কাঁদতেও পারিনা আমরা। সেই অধিকার আমাদের নেই। আমরা আমাদের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা ও সুখ-দু:খের ৫ বছর মেয়াদি ঠিকা দিয়ে দিই গুটি কতেক লোকের হাতে। তারা দয়া করে আমাদের হাসতে বললে আমরা হাসবো, কাঁদতে বললে কাঁদবো, ব্যস। তাহলে অহেতুক বিতর্কের পেছনে ছুটে দরকার কি!

থাকুক অসব কথা। বাঙালি-বাংলাদেশি নিয়ে মাথা আমরা না ঘামালেও চলবে। আমরা বরং ওয়ানটাইম বাঙালিদের নিয়ে কথা বলতে পারি।

যে কোনো দিন, টিএসসি মোড়, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফ্যান্টাসি কিংডম অথবা দেশের বিশ্ববিদ্যালযগুলোর সোনালি বিকেল। ঘুরে আসুন একবার। রং উঠা ছেড়াফাড়া জিন্স, টি-শার্টে আবিস্কার করবেন শতশত মানুষ। কপাল কিংবা মাথায় সানগ্লাস, গলায় চেইন, হাতে ব্রেসলেট, কানে দুল। মানুষ বললাম কারণ, আমি ১০০ টাকা বাজি রেখে বলতে পারি, বাহ্যিক দৃষ্টিতে আপনি চিনতে পারবেন না এদের মধ্যে কারা তরুণ আর কারা তরুণী! আলো-আঁধারির নীলাভ মিলনমেলা চায়ানিজ যাদের লাঞ্চ কিংবা ডিনারের ঠিকানা। ড্যাডি-মাম্মিতে অভ্যস্ত এই প্রজন্ম কখনো যদি-বাবা-মা কারে কয়, এই প্রশ্নও করে বসে, অবাক হবার কিছু থাকবে না।

তাই বলে এরা যে পশ্চিমা মোহে পড়ে বাঙালি সংস্কৃতি একেবারেই ভুলে গেছে, এটা ভাবলে ভুল হবে। এটা প্রমাণ করবার জন্যে পহেলা বৈশাখ তো রয়েছেই। পহেলা বৈশাখে আমাদের তরুণ-তরুণীরা প্রচন্ড আবেগ নিয়ে এসে জড়ো হয় রমনা বটমূলে। হিন্দি ছবির অর্ধেকটা দেখে বাকি অংশ গিয়ে দেখবার নিয়ত করে চলে আসে বাঙালিত্বেরই টানে! যে টান হৃদয়ে লালিত হবার কথা, অতি আবেগে সেটা কখনো কখনো চলে আসে হাতে। মাঝেমধ্যে কিছু হাত আবার চলে যায় কোনো ওড়নার সন্ধানে! অতি বাঙালিত্বের উন্মাদনায় ওরা ভুলে যায় এমনি এক নিউ ইয়ার সেলিব্রেটের রাতের সাথেই জড়িয়ে আছে বাধন'দের আর্তচিৎকার। সাথে বিকারদের পৈশাচিক হাসি। এতো ভুলো মন কেনো আমাদের!

পহেলা বৈশাখের ভোরে বর্ষবরণের আঙিনায় স্বাগত আপনাকে।
 কিছুক্ষণের জন্য চোখ জুড়িয়ে যাবে আপনার। অতি আধুনিক মানুষগুলোকে আবিস্কার করবেন খাটি বাঙালি পোশাকে। লাল পাড় সাদা শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবি-পা’জামা পরা মানুষ। স্যান্ডউইচ বা বার্গার না, তাদের সামনে দেখবেন আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির সানকিতে পান্তার ফাঁকে চিকচিক করছে পদ্মার ইলিশের ঝোল।

পিঁয়াজ ও কাঁচামরিচে তৃপ্তির কামড় দিয়ে চোখে মুখে এমন অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে, যেনো অমৃতের ঝরনায় সবেমাত্র গোসল করে উঠলো তারা! যদিও অনভ্যাসের কারণে সন্ধ্যেবেলা তাদেরকে আবার ভিড় জমাতে দেখা যায় পাশের ফার্মেসিগুলোতে, ওরস্যালাইনের খুঁজে। সেটা ভিন্ন ব্যপার।

আমরা মনে করি, সারা বছর যারা ডুবে থাকে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে। বাংলা নববর্ষের আঙিনায় জড়ো হবার কোনো অধিকারই তাদের নেই।

এদেশের অসহায় মানুষ ঘরের চালের ছিদ্র এবং তাদের চোখ দিয়ে একই সাথে টপ টপ করে পড়তে থাকা পানিতে ভিজে স্যাঁতসেত মেঝেয় বসে পান্তা খায় লবন ও মরিচ মাখিয়ে। ইলিশের গন্ধ তাদের কল্পণাতেই তাকে শুধু। অরা পান্তার আশ্রয় নেয় বেঁচে থাকবার জন্যে। অসহায় মানুষের কষ্টের অংশিদার  না হতে পারি, সেই গরিবের খাদ্য নিয়ে এই ধরনের উপহাস করবার কোনো অধিকারই কারো নেই।

সারা বছর চায়নিজ-থাই খাবার খেয়ে আপ মডেলের মার্সিটিজ-বিএমডব্লিউ হাঁকিয়ে পহেলা বৈশাখ চলে আসবেন বটমূলে! বাঙালি হতে! এটা তো মানবিক অপরাধের পর্যয়ে পড়ার কথা। যেমন আছেন, যেভাবে আছেন, তাই থাকুন। একদিনের বাঙালি হবার দরকার কি??

আমরা আশা করতে চাই, ৩০মে চৈত্র ১৪১৮’র সাথে সাথে আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিক আমাদের মনের ভেতরের যত আবর্জনা। বিদায় নিক যত শঠতা। বিদায় নিক বর্তমান নিয়ে, আগামী নিয়ে যত সংশয়।

পহেলা বৈশাখ আসুক। থাকুক আমাদের সঙ্গে, আমাদের স্বরণ করিয়ে দিতে, আমরা বাঙালি। আচ্ছা আমরা কি শপথ নিতে পারিনা, বাঙালি হবার!
কথায় তো হয়েছি।
কাজে হবার???

বুধবার, ৬ এপ্রিল, ২০১১

বাদশা নামদার, জনাবে আ’লা: যদি কিছু মনে না করেন...!!!

  বাংলাদেশের বহুধাবিভক্ত উলামায়ে কেরামের ছোট্ট একটি অংশের সিংহাসনের মালিক, একলা চলো নীতি’র ধারক মুফতি ফজলুল হক আমিনী’র ডাকে ৪ঠা এপ্রিল সারাদেশে পালিত হলো সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। কীভাবে কী হলো, অথবা যেভাবেই যা হোক, হরতাল সফল হয়েছে। সরকারকে এই ম্যাসেজটি পাঠানো গেছে, পানক সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকানোর  খাহেশ থাকা ভালো না! সরকারের থিংক ট্যাংক বোধকরি ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, আলেম সমাজের ছোট্ট একটি অংশের ডাকা হরতালের চেহারা যদি এমন হয়,  সারাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে, রাস্তাঘাট হয়ে যায় যান শূন্য,  তাহলে আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি হরতাল আহবান করলে কী হবে অবস্থা! তখন রাস্তায় একটি পিঁপড়াও খুঁজে পাওয়া যাবে কি না- বলা মুশকিল!
মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে সরকারকে একটি সু-সংবাদ দিতে চাই আমি। বলতে চাই, আমার কথায় খামাখা ভয় পেয়ে টেনশান করে প্রেসার হাই করার দরকার নেই। এদেশের আলেম-উলামা বিচ্ছিন্ন থেকে থেকে প্রয়োজনে শহীদ হয়ে যাবেন তবুও ঐক্যবদ্ধ হবেন না। সব ভুলে একটি মাত্র ব্যানারের পেছনে তাঁরা কোনোদিনই জড়ো হবেন না। এই যে আমি ‘তাঁরা’ সর্বনামটিতে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করলাম, সম্মানজনক কাউকে উদ্দেশ্য করলে ‘তাঁরা’তে চন্দ্রবিন্দু দিতে হয় বলে, আমাদের উলামা হযরাতগণের মধ্যে এমন কাউকে এবং অনেককে আমরা পরিচয় করিয়ে দিতে পারি, যারা পরস্পরের জন্য এই সামান্য চন্দ্রবিন্দুটুকু পর্যন্ত ব্যবহার করার মতো উদার হতে পারেন না!  সুতরাং সরকার! নো টেনশান! নিশ্চিত থাকতে পারেন।
দুই\
এবার হরতালের কাহিনী বলি।
বলা নেই, কওয়া নেই, নিজস্ব ব্যানারে হুট করে একটি হরতাল ডেকে বসলেন মুফতি আমিনী! যদিও আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সার্বজনীন ইস্যু, নারী নীতি, ফতওয়া বিরোধী রায় বাতিল ও শিক্ষানীতি’র ইসলাম বিরোধী ধারা বাতিলের দাবিতে ছিলো এই হরতাল। কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে কথা বললে বা আন্দোলন করলে তো লাভ হবে না। আমিনী সাহেবের সিনিয়ার আলেমরা অনুরোধ জানালেন। হরতালটি স্থগিত করেন। আলাদা করে কর্মসূচি দিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করা ঠিক না। যা করার, ঐক্যবদ্ধভাবেই করা দরকার। আমিনী সাহেব সিদ্ধান্তে অনড় ! হরতাল হবেই। হাল ছেড়ে দিলেন বাকিরা। একজন না মানলে কী আর করা!
আমরা, সাধারণ মুসলমান পড়লাম বিভ্রান্তিতে! আজ দেখি, অমুক আলেম পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বলছেন, এই হরতালে আমাদের সমর্থন নেই। আবার হরতালের পক্ষে আলেম-উলামাদের সমর্থনের চার রঙা বিজ্ঞাপনে তাঁদের নামও শোভা পায়! আমরা বুঝতে পারিনা কোনটি সত্য আর কোনটি তথ্য বিভ্রাট! ফলে হরতালকে ঘিরে ক্রমেই জমাট বাধতে থাকে বিভ্রান্তির বিব্রতকর ধোঁয়া।
 এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ উলামায়ে কেরামকে মন থেকে ভালোবাসে। তাঁরা কোনো অবস্থাতেই চায়না আলেমদের সম্মান ভূলন্ঠিত হোক। হতাশ হয়ে পড়লো এরা। হরতাল ডেকেছেন মুফতি আমিনী। সারা দেশে আমিনী সাহেবের ক’ডজন কর্মী আছে, আঙুলে গুনেই বলে দেয়া যাবে। তাহলে হরতাল সফল করতে মাঠে নামবে কারা? আবার হরতাল ব্যর্থ হলে লোকে বলবে, মোল্লাদের হরতাল ব্যর্থ হয়েছে!  কেউ মানেনি!  ফলে আলেম-উলামার আগামী আন্দোলন হয়ে পড়বে গুরুত্বহীন। উপযোগ কমে যাবে আন্দোলনের। উভয় সংকট বলে যে একটা সমস্যা আছে, আলেমরা ভোগতে শুরু করলেন সেই সমস্যায়। আর সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো কোথাকার পানি কোন দিকে গড়ায়, দেখবার জন্যে।
হরতাল ৪ এপ্রিল সোমবার।  হরতালের আগের দিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হলো যশোরের ছেলে হুসাইন। ১৯ বছরের এই মাদরাসা ছাত্র ভাইটি আমার অংশ নিয়েছিলো হরতালের প্রচার মিছিলে। হুসাইনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নি:¯প্রাণ হরতাল সাফল্যের সুবাস পেতে আরম্ভ করলো। মুখ রক্ষা পেলো মুফতি আমিনীর। ইজ্জত রক্ষা হলো উলামায়ে কেরামের। আর এই হরতাল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জন্ম নেয়া অনেকগুলো প্রশ্ন  আগামীর জন্য থেকে গেলো অমীমাংসিত আকারেই।
তিন\
এবারে কিছু কঠিন কথা বলতে যাচ্ছি আমি। অনেকেই নাখোশ হবেন জানি। তিরোস্কারের তীর ছুড়ে দেবেন আমার দিকে। সমস্যা নেই। বুক পেতে নেবো । লোকচুরি খেলাকরে অভ্যস্ত কেউ কেউ আবার তাকাবেন ৯০ ডিগ্রি বাঁবা চোখে। সমস্যা নেই। গায়ে মাখবোনা কিছু।  কঠিন সত্য বলবার জন্য কিছু মানুষের চামড়াকে করে ফেলতে হয় গন্ডারের চামড়া। গন্ডার হতে আমার আপত্তি নেই। সিংহ শাবকদের ভেড়ার পাল থেকে বের করে নিয়ে আসতে, জাগিয়ে তুলতে, শুধু গন্ডার কেনো, মহা গন্ডার হতেও আপত্তি নেই আমার।
হরতাল ৪ এপ্রিল। ৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭ টায় সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে  আড্ডা দিচ্ছি। আড্ডার বিষয়: যশোরে মাদরাসা ছাত্র হত্যা। তখন এক সাংবাদিক বন্ধু আফসোস করে বললো, আমরা অবাক হচ্ছি রশীদ ভাই! এখানে বসে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছি আমরা। কিন্তু আজ তো আমাদের এভাবে রিলাক্সড হয়ে বসে থাকার কথা ছিলো না! বিনা অপরাধে একটি ছাত্রকে গুলি করে মেরে ফেললো পুলিশ। কওমী মাদরাসার ছাত্রকে। সারা দেশে কয়েক লক্ষ কওমী ছাত্র আছে না! ওরা কোথায়? এখন তো সারা দেশ বিক্ষোভে দিশেহারা হয়ে যাবার কথা ছিলো। আমাদের হিমশিম খাবার কথা ছিলো সংবাদ কভার করতে করতে। ব্যাপার কী? কিছুই তো বুঝলাম না! আমিনী সাহেব কেমন আন্দোলন করছেন!
মনটা খারাপ করে বেরিয়ে এলাম আমি।  ইসলামী ভাবধারার সাথে সম্পর্কহীন একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক, ধর্মীয় পরিচয়ে যে আবার মুসলমানও না, সেই বন্ধুটির মাঝে আমি যে মানবিক অনুভূতির জাগরণ লক্ষ করলাম, তার ছিটেফোটাও দেখা গেলো না আলেম-উলামাদের মাঝে। ভীষণ রকম খারাপ হয়ে গেলো মনটা। প্রায় নির্ঘুম একটি রাত পার করলাম।
      হরতালের দিন, সারাদিন ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আমাকে। পেশাগত কারণেই। রাস্তায় বেরিয়ে বিস্মিত হলাম আমি! রাজপথ মাদরাসা ছাত্রদের দখলে।  ঘুরে ঘুরে, সিলেট শহরের অলি-গলিতেও দেখলাম একই দৃশ্য। এদের বেশিরভাগই মুফতি আমিনীর সমর্থক না। এদের অনেকেই রাজনীতি থেকেই নিরাপদ দূরে থাকতে পছন্দ করে।  তবুও তারা মাঠে। কারণ কী?
মুহুর্তেই বিষয়টি ক্লিয়ার হয়ে গেলো আমার কাছে। মুরব্বীরা হুসাইনের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলেও ছাত্ররা পারেনি।  ভ্রাতৃত্বের টানে বেরিয়ে এসেছে তারা। স্বাভাবিক কারণেই মনটা ভরে গেলো কানায় কানায়।  চোখ দু’টো ভিজে উঠলো। এক ভাইকে মেরে ফেলেছে, অন্য ভাই ঘরে বসে থাকতে পারে না। থাকেও নি।  খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাংলাদেশের হাজার হাজার কওমী মাদরাসার এদিনের চেহারা ছিলো ভিন্ন।  ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এসেছে ছাত্ররা। বাধ ভাঙা জোয়ারের মতো। ছাত্রদের এই আবেগের পথে মাদরাসা কর্তৃপক্ষও, যাদের অধিকাংশই হরতালের সাথে ছিলেন না, বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বেরিয়ে আসতে দিয়েছেন। সময়ের তাক্বাজাকে চমৎতার দক্ষতায় বিশ্লেষন করতে পারায় উস্তাদদের প্রতি আমাদের বিনম্র সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা। 
হরতাল পর্যবেক্ষণ করতে যেয়ে প্রতিটি ছাত্রের চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলতে দেখেছি আমি। তাদের বেদনামলীন চেহারার দিকে তাকিয়েছি। চেষ্টা করেছি তাদের মনের ভাষা পড়তে। তাদের অনুচ্চারিত বিক্ষোব্ধ হতাশার কথা জানতে। যেটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি আমি, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। তাদের ভেতরের মানুষগুলো চিৎকার করে বলছে, আমার ভাইকে মেরেছিস! মার, আমাদেরকেও মার। কতো রক্ত চাই তোদের? নে। আমরা বুক পেতে দিতে এসেছি। আমার ভাই যে অপরাধ করেছিলো, আমরাও সে অপরাধ করছি। জেনে-বুঝেই করছি।  মার আমাদের। কর গুলি। আর না হলে জবাব দে, আমার ভাইকে মারলি কেনো??
পুলিশ জবাব দিতে পারেনি। জবাব যে তাদের নিজেদেরও জানা নেই। সরকারও নিরব! জবাব নেই সরকারের কাছেও।  জবাব দিলো গরিব রিক্সাচালক, তাঁর রিক্সাটি বন্ধ রেখে। জবাব দিলো গরিব ভ্যান চালক, তার ভ্যানটি বন্ধ রেখে। জবাব দিলো গলির মোড়ের পান দোকানী, তাঁর দোকানটি বন্ধ রেখে। সাধারণ মানুষ জবাব দিলো হরতাল সমর্থন করে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ হরতালের পক্ষে থেকেছে কুরআনের সম্মানে। আর মাদরাসা ছাত্ররা সারাদিন রোদে পুড়ে না খেয়ে রাজপথে অবস্থান করেছে তাদের ভাই হুসাইনের জন্য। আর এই ফাঁকে সফল হয়ে গেলো আমিনী সাহেবের হরতাল। হিরো হয়ে গেলেন মুফতি আমিনী। আর যা হোক, যেভাবেই হোক, রক্ষা পেয়ে গেলো উলামায়ে কেরামের ভাবমূর্তি।
চার\
চার তারিখের হরতাল সর্বাত্বক সফল হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে স্বস্থি পেয়েছি আমি। আলেম সমাজ বেঁছে গেছেন বেইজ্জতি থেকে। কিন্তু এভাবে তো আর চলে না। আন্দোলন করতে হলে তো সু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে লাগবে। আন্-ডিসিপ্লেন্ড্ কাজ আর উদ্দেশ্যহীন ছুটন্ত ঘোড়ার মাঝে খুব কিছু ব্যবধান নেই তো ।  দায়িত্বহীনতা আর কান্ডজ্ঞানহীনতার মাঝে ফারাকও নেই । আমাদের নেতৃবৃন্দের লিডারশিপ কোয়ালিটি আরো ডেভেলপ করার দরকার আছে কিনা, ভেবে দেখা দরকার। প্রতিটি কর্মীকে নিজের সন্তান ভাবতে হবে। তবেই না সেটা ইসলামী আন্দোলন।
 কেনো বলছি এ কথা!
যাদের ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন দিলো হুসাইন, খুব খারাপ লেগেছে আমার, যখন জেনেছি, সেই মহান নেতাদের একজন কেউ ছেলেটির যানাজায় পর্যন্ত গিয়ে শরীক হবার সময় পাননি!। কেনো? একটি জীবনের মূল্য কি এতই কম?  কেনো যাননি কেউ? পরদিন হরতাল, তাই ব্যস্ত ছিলেন। আরে ! যে ছেলেটির জীবন উৎসর্গিত না হলে মাঠে মারা যেতো হরতাল, শুকরিয়া আদায় করার জন্য হলেও তো তার যানাজায় হাজির হওয়া উচিৎ ছিলো। মুফতি আমিনী সাহেবের কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারলে ভালো হতো। এই ছেলেটির বাবার নাম যদি হতো মুফতি ফজলুল হক আমিনী, তাহলে কি কোনো ব্যস্ততা আটকে রাখতে পারতো তাঁকে! কী বলেন মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব? আপনাকেও বলছি।


হরতাল পালিত হলো ৪ঠা এপ্রিল। ৬ এপ্রিল  দেশের শীর্ষ আলেম, আলেম সমাজের আস্থার প্রতীক, আল্লামা আহমদ শফী’কে আমীর করে গঠিত হলো সর্বদলীয় ইসলামী ঐক্য পরিষদ।  দলমত নির্বিশেষে দেশের সবগুলো ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করলেন। উপস্থিত হলেন মুফতি আমিনীও। সভা’র শুরুতেই ৪ তারিখের হরতালের ব্যপারে নিজের অবস্থান ব্যখ্যা করলেন আহমদ শফী। বললেন, হরতালের সমর্থনে আমার কোনো বিবৃতি ছিলো না। আমার নামে পত্রিকায় বিবৃতি গেছে অথচ আমার সাথে কোনো যোগাযোগই করা হয়নি! আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখার পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্তেও কপট রাগ দেখিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করলেন আমিনী সাহেব। এ কেমন আচরণ!
এরপর একে একে বেরিয়ে আসতে লগলো এমন আরো অনেক কিছু। দেখাগেলো, যে সব উলামা-মাশায়েখের নাম ব্যবহার করে পত্রিকায় বিবৃতি পাঠানো হয়েছিলো বিজ্ঞাপন আকারে, তাদের অধিকাংশই  জানেন না ! আমিনী সাহেব আলেম-উলামাকে ইমোশনাল ব্লাকমেল করেছেন।
আমি ছোট মানুষ। হাত বাড়ালেই আমিনী সাহেবের মতো বড় নেতাকে নাগাল পাবো না। কেউ কি তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন,  নিজের ইমেজের প্রতি তাঁর এতই যদি আস্থাহীনতা, বাস্তব উপলব্দি যদি এতই প্রখর হয়ে থাকে, তিনি যদি বুঝতেই পারেন, আমার একা’র আযানে মুসল্লি পাওয়া যাবেনা, তাহলে তিনি একা থাকেন কেনো?
সরাসরি জিজ্ঞেস করবেন, আলেম-উলামা তো আপনাকে প্রাপ্য মর্যাদাসমেত সাথে নিয়েই কাজ করতে চান। আপনি সবসময় ডিগবাজি দিয়ে সরে যান কেনো?  নেতা তো আপনি আছেনই। একক নেতৃত্ব চান? আর এজন্য একলা চলো নীতি?  স্বীকার করছি আপনি বড় আলেম। কিন্তু  যদি ভাবেন আপনিই বাংলাদেশের একমাত্র আলেম বা সবচে’ বড় আলেম, আপনার উপরে আর কেউ নেই বা থাকতে নেই, তাহলে তো সেটা হবে বালখিল্যসুলভ ভাবনা।

পাঁচ\
আন্দোলনের ডাক দেবেন। তা মুফতি আমিনী হোন আর অন্য যে-ই,  ছেলেরা রাস্তায় নামবে। কষ্ট করে আন্দোলন সফল করে দেবে। পুলিশের মার খাবে। গুলি খেয়ে মারা যাবে। যানাজায় পর্যন্ত যাবেন না। সন্তানহারানো বাবা লোকটির কাধে শান্তনার হাতটি পর্যন্ত রাখবেন না। এ জন্য পঞ্জিকা দেখে তারিখ ঠিক করবেন। কেমন করে হবে?
      ছেলেরা রাস্তায় নামবে। পুলিশ তাদের পেঠাবে গরু-ছাগলের মতো। মেরে হাত-পা ভেঙে দেবে শত শত ছেলের। যন্ত্রণায় কাতরাবে ছেলেগুলো। ফিরেও তাকাবেন না। তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেবেন না। তাহলে তো হবে না।
      পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে আরো কয়েকশ’। মামলা হবে তাদের বিরুদ্ধে।  নেতারা গা ছাড়া ভাব দেখাবেন। ছেলেদের ছাড়িয়ে আনতে তড়িৎ উদ্যোগ নেবেন না। তাহলে কীভাবে হবে?
হরতালের আগে মাইকিং করতে থাকা ছয়টি ছেলেকে ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ। আমি মুক্তাগাছার কথা বলছি। সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত হাজতে কাটিয়ে এরো তারা। কিন্তু সারাটা দিন ছেল্গেুলো কিছু খেলো কি না-খোঁজ নেয়নি কেউ। জেনেই বলছি আমি। কেউ একজন নেতা একটি কলা বা পাউরুটি নিয়েও যাননি। ভুল বুঝবেন না আবার। ভাববেন না তারা ব্যস্ত ছিলেন ছেলেদের জেল থেকে বের করার কাজে। এতো দরকার নেই তাদের। ঢাকা থেকে একটি প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক, আমার অগ্রজ বন্ধু অনেক চেষ্টা-তদবীর করে ছেলেগুলোকে ছাড়িয়ে আনেন।  এ কেমন অবস্থা?
ছয়\
মূল যে ইস্যুটি নিয়ে ছিলো এই হরতাল, নারী নীতি, সেটা নিয়ে অনেক কিছু বলবার দরকার আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। আলেমরা বলছেন, কুরআন বিরোধী কোনো আইন করতে দেয়া হবে না। সরকার বলছেন, কুরআন বিরোধী কোনো আইন আমরা করবোও না। তাহলে মৌলিক ক্ষেত্রে দূরত্ব তো নেই। নারীনীতি দেখা আছে আমার। শব্দের মারাতœক মারপ্যাঁচ রাখা হয়েছে। এখন, সরকার যেহেতু বলছেন, নারী নীতিতে সম্পদ বলতে উত্তরাধীকারের কথা বুঝানো হয়নি, তাহলে সামান্য একটি পদক্ষেপ নিলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একটি মাত্র বাক্য যুক্ত করে ফেললেই হয়। আলেমরাই বা কেনো এই প্রস্তাবটি করছেন না। বাক্যটি হতে পারে এমন: মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী নারীর প্রাপ্য সম্পদে নারীর পূর্ণ অধীকার নিশ্চিত করা হবে। ব্যস, তাহলেই তো হয়ে যায়।
ইদানিং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করছেন তাফসীর স্টাইলে। আমরা মুগ্ধ হচ্ছি। যে দেশের প্রধান নির্বাহী কুরআন শরীফের আয়াত নাম্বার বলে বলে জনসভায় বক্তৃতা করেন, সেই দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম হতে খুববেশি মনে হয় বাকী নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূল্যবান তাফসীর শুনে আরেকজনের তাফসীর মনে পড়ে গেলো। একলোক ঘোষণা করলো নামাজ পড়ার দরকার নাই। আল্লাহপাক বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা নামাজের কাছেও যেওনা’। তাকে বলা হলো, অই ব্যাটা, এই গাঁজাখুরি তথ্য তুই কোথায় পেলি? সে বললো, কেনো! পবিত্র কুরআন শরীফেই তো আছে। বলা হলো, চল দেখি তোর কোন কুরআন শরীফে এ কথা লেখা। সে কুরআন শরীফ খুলে দেখালো। লোকেরা দেখলো সত্যিই লেখা-‘হে ঈমানদারগণ তোমরা নামাজের নিকটবর্তীও হয়োনা’। লোকেরা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ী করতে লাগলো। পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেব কোথায় জানি দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। তিনি এসে দেখলেন ঘটনা প্যাঁচ খেয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, অই ব্যাটা! পৃষ্ঠা উল্টা। পৃষ্ঠা উল্টানো হলো। আয়াতের বাকী অংশ হচ্ছে ‘নেশাগ্রস্থ অবস্থায়’। অর্থাৎ ‘হে ঈমানদারগণ তোমরা নামাজের কাছেও যেওনা নেশাগ্রস্থ অবস্থায়’।
আমাদের নেত্রীকে যারাই আয়াত সাপ্লাই দেন, তারা তাদের জন্য সুবিধাজনক অংশগুলোই কেবল নেত্রীর সামনে হাজির করেন। নেত্রী দেখেন, আরে! আল্লাহ তো দেখছি আমাদের মতোই বলছেন। তাহলে মাওলানা খামাখা চিৎকার করছে কেনো? আমরা বলি বাদশা নামদার। এ ব্যাপারে আরেকটু সিনসিয়ার হওয়াটাই কি ভাল না? এদেশের পোড় খাওয়া আলেম-উলামা পবিত্র কুরআনের একটু আধটু তরজমা তাফসীর করেই দিন কাটান। তাদেরকে বেকার করে দেয়া কি ঠিক হবে।
জনাবে আ’লাকে বলি, টেবিল টকিং এর মাধ্যমে বিষয়টি শুরাহার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আর আন্দোলনে গেলে, ছেলেদের দায়দায়িত্ব নিন। আর সম্ভব হলে একলা চলো নীতি ত্যাগ করে মুরব্বীদের সাথেই থাকুন। 

সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০১১

হরতালের পোষ্ট মর্টেম



আমরা কী করছি? আমরা কি সঠিক পথে এগুতে পারছি? সব ঠিক আছে আমাদের? আমরা কি দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখতে পারছি? আমার তিক্ত কথাগুলো হয়তো অনেকেরই পছন্দ হবেনা। তাতে কি! আমি তো আর আমার বোধ'র সাথে প্রতারণা করতে পারি না!


আমি ভাবি, বোধগুলো আমাদের কোথায় হারিয়ে গেলো?  আমার একটি ভাই, কওমী মাদরাসার একটি  ছাত্রকে মেরে ফেলা হলো গুলি করে, আমরা সেভাবে গর্জে উঠতে পারলাম না যেভাবে পারা উচিৎ ছিলো!  

যে যে দলই করুন, কওমী মাদরাসাগুলোর তো এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নিরব বসে থাকার কথা ছিলো না! আমি যশোরের হুসাইনের কথা বলছি। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দুর্ভাগ্যজনক নিরবতা আমাদের কষ্ট দিয়েছে খুব!


 অবশ্য মুরব্বীরা বসে থাকলেও বসে ছিলোনা দেশের কওমী ছাত্ররা। ভ্রাতৃত্বের টানে গতকাল তারা বেরিয়ে এসেছিলো রাস্তায়। তাদের মাঝে একটি অনুভূতিই কাজ করছিলো। আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, আমরা বসে থাকতে পারি না! 

৪এপ্রিল সারাদেশে হরতাল হয়েছে। মোটামুটি সফল হরতাল, বলাই যায়! এর প্রধান কারণ ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ছাত্ররা স্বতঃস্ফুর্তভাবে নেমে এসেছিলো রাজপথে। কে হরতাল ডেকেছেন, সেটা কোনো ব্যাপার ছিলো না।
আমাদের কথা হলো,  হরতালের আগের দিন যশোরে যে ছেলেটি মারা গেলো ,কিশোর ছেলেটি, আমার ভাইটি, তার কী হবে? আল্লাহর কাছে সে শাহাদাতের মর্যাদা পাবে, ঠিক আছে। নেতাদের কাছ থেকে সে কী পেলো? কেন্দ্র থেকে নেতারা কি কেউ গিয়েছিলেন ছেলেটির বাবা-মা'র কাছে? 
যাওয়া কি উচিৎ ছিলো না?
শান্তনার হাতটি রেখেছিলেন পুত্রহারানো বাবা লোকটির কাধে? 
রাখা কি উচিৎ ছিলো না?

হুসাইন নামক ভাইটি আমার মারা গেলো কোরআনের জন্য। সে ভাগ্যবান। দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা তাকে সামান্য সম্মানটুকু জানাতে পারলাম না ! গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের মতো আমরাও  কি ব্যবহার করলাম  হুসাইনকে! তার লাশকে ব্যবহার করলাম হরতালের ঢাল হিসেবে??

কেনো বলছি এ কথা?
কারণ, আমি যদ্দুর জানি, হরতাল আহবানকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউই ছেলেটির জানাজায় পর্যন্ত গিয়ে শরীক হননি!
কেনো?
একটি জীবনের দাম কি এতই কম?

বললে বোধ’য় অত্যুক্তি হবে না বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি এবং কওমী মাদরাসা একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অভিন্ন সাবজেক্ট। একটির গায়ে আচড় লাগলে ব্যথা অনুভূত হয় অন্যটির শরীরে। হবারই কথা। এদেশে ইসলামী রাজনীতির মূল উপকরণ ধরা হয় কওমী মাদরাসার ছাত্রদের।

ইসলামী সংগঠনের আলেম নেতারা সভা ডাকলে পোস্টারিং মাইকিং এর কাজগুলো তো এদেরই করতে হয়। হরতাল টাইপ আন্দোলনের ডাক দিলে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পুলিশের কাঁদানো গ্যাস ও লাঠিপেটা খেয়ে আন্দোলন সফল করবার জন্য মাঠে তো নামতে হয় এই কওমী মাদরাসা ছাত্রদেরই। এরা হলো রিজার্ভ ফোর্স।

এত ব্যবহার করি আমরা ছেলেগুলোকে, অথচ তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ভিশন সেট করতে চাই না। কখনো কি ভেবে দেখেছি এই ছাত্রগুলোর  প্রতি আমরা সুবিচার করতে পারছি কি না!

মুফতি আমিনি সাহেবের ডাকে সারা দেশে হরতাল পালিত হলো। যদিও দেশের সকল শীর্ষ আলেম-উলামা হরতাল সমর্থন জানাননি। কিন্তু  রাজপথে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র! দলমতের উর্ধে উঠে আলেম-উলামা এবং কওমী মাদরাসা ছাত্ররা নেমে এসেছিলেন মাঠে।
কেনো?
আমিনি সাহেবের সম্মানে?
মুফতি আমিনিকে সফল নেতা বানানোর জন্যে?
মোটেও না।
কেনো তবে??
কারণ, উলামায়ে কেরামের বর্তমান অবস্থান ও প্রশ্নবিদ্ধ আগামী আরো যাতে ছন্নছাড়া হয়ে না যায়, মানুষ যাতে মনে না করে, আলেমদের হরতাল  ব্যর্থ হয়েছে, আলেমরা ব্যর্থ হয়েছেন, শুধু এই কারণেই ।

আমার প্রশ্ন অন্য জাগায়। নেতাদের কাছে আমাদের জানতে চাওয়া খুবই সামান্য,
গতকালের হরতালে শত শত ছাত্র আহত হয়েছে। এদের চিকিৎসার ভার কে নেবে?
শতাধীক গ্রেফতার হলো। এদের ছাড়িয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেয়া হলো? দায়ছাড়া ছন্নছাড়া নেতৃত্ব দিলে তো হবেনা। 
হরতাল ডাকবেন, ছাত্ররা আহত হবে, চিকিৎসার দায় নেবেন না! তাহলে তো হবে না!

ছেলেরা জেলে যাবে, ছাড়িয়ে আনতে চেষ্টা করবেন না! ঠিক যেভাবে হরতালের আগের দিন মুক্তাগাছা থেকে ৬ জন মাদরাসা ছাত্রকে গ্রেফতার করে সারাদিন আটকে রাখা হলো। কোনো নেতা সারাদিন তাদেরকে ছাড়িয়ে আনতে যাননি! ছাড়াতে যাবেন তো পরের কথা। সারাদিন ছেলেগুলোর জন্য  এক বোতল পানি পর্যন্ত পাঠাননি!! 
এমন হলে তো হবে না!


 অবস্থা যদি এমন হয়, আর তারপরেও ভাবেন,  এই ছেলেরা ইসলামী হুকুমত কায়েমের জন্য আজীবন মাঠে থাকবে!! আপনাদের পেছনে পেছনে জিন্দাবাদের স্লোগান দিয়ে দিয়ে মাঠ কাঁপাবে!
তাহলে এই ধারণা ব্যুমেরাং হতে খুব বেশি দিন লাগবে বলে তো মনে হয় না।

রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০১১

তোমার শূন্যতা...

  বায়তুল মোকাররাম জাতীয় মসজিদের মরহুম খতিব মাওলানা উবায়দুল হক রাহ.’র
আত্মার প্রতি নিবেদিত খোলাচিঠি
তোমার শূন্যতা
প্রিয় পূণ্যত্মা। সালাম জানাই। আশা নয়, বিশ্বাস, শান্তিতেই আছেন। থাকবারই কথা। পূণ্যতার সিঁড়ি ভেঙেছেন, জীবনভর, পূর্ণতার চূড়ায় আরোহণ করবেন বলে। যার জন্য ছিলো অস্তিত্ব, জীবনের সূর্যোদয়, শরত-হেমন্ত, সুখ-আনন্দ, কষ্ট-জরা এবং বেঁচে থাকা, তার তুষ্টিতে রাত করেছেন দিন, এশা থেকে ফজর, ফজর থেকে এশা। আজ তাঁকে কাছে পেয়েছেন। অথবা কাছে গেছেন বিশেষ মেহমান হয়ে। ভালো যে থাকবেনই, না বোঝার কী আছে?
প্রিয় খতিব!
আপনাকে লিখছি কেনো?
আল্লাহর পথে যারা জীবন উৎসর্গ করেন, তাদেরকে মৃত বলতে হয়না। যেমন আপনি। বিশেষ জীবনে আছেন। যে জীবনের রুলস্-রেজুলেশন একটু ভিন্ন। জানি আমরা, আপনি এখন আর নিজের অর্জনকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু প্রিয়জনদের জন্য অনেক কিছুর তদবির করতে পারবেন। এই সুযোগটি আমরা নিতে চাই। আমরা আপনার প্রিয় তালিকায় পড়ি কিনা- জানি না। হয়তো পড়ি! হয়তো পড়িনা। অবস্থা যেমনই হোক, আজ আমি আমার কথাগুলো আপনাকে বলবোই। এই দৃঢ়তায়, পরম করুণাময় বিশেষ ব্যবস্থায় সেটা আপনার কাছে পৌঁছে দেবেন। তারপর হয়তো তিনিই আবার আপনাকে মর্টিভেট করবেন আমাদের হয়ে তাঁর কাছে চাইতে।
প্রিয় খতিব!
জানতে চাইবেন না আমরা কেমন আছি? কেমন আছেন আপনার সহকর্মী আলেম-উলামা? কেমন আছে আপনার বায়তুল মোর্কারাম? আপনার প্রিয় দেশবাসী?
আমরা ভালো নেই খতিব। মোটেও ভালো নেই আমরা। এ জন্য দায়ী কিন্তু নিজেরাই। আমাদের অহমিকা, একঘেয়েপনা, একদর্শিতা, আত্মবিকৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। সবগুলো বলতে শুরু করলে এতো শান্তির ঠিকানায় থেকেও কষ্ট পাবেন আপনি। আপনার বুকের বামপাশে, হার্ট যেখানটায় আছে, ঠিক তার  নিচেই অনুভব করবেন চিনচিন ব্যথা! তবুও শুনুন! কিছুকথা আপনার শোনা দরকার। আপনার বায়তুল মোকাররাম আজ আর আলেমদের হাতে নেই। যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে আপনি খুতবা দিতেন, সেখানে আজ আসন পেতেছেন একজন প্রফেসর! জনশ্র“তি আছে এই ভদ্রলোকের আবার মসজিদ থেকে মাজারের দিকেই বেশি আকর্ষণ।
আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না খতিব। যে বস্তুটিকে আমরা এখন খতিব বানিয়ে বায়তুল মোকাররাম আলোকিত করবার দায়িত্ব দিয়েছি, তার ভেতর-বাইর কতো বেশি অন্ধকার! কুরবানীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কোথাকার কেউ একজন চ্যালেঞ্জ করে বসলো আদালতে। খতিব হিসেবে জানতে চাওয়া হলো তার কাছে। তিনি বললেন, খতিয়ে দেখবো! ক্লাস ফাইভের একটি বাচ্চাও যে মাসআ’লাটি জানে, খতিব সাহেব সেটা খতিয়ে বের করবেন। চিন্তা করেন অবস্থা?
এই ভদ্রলোকের কথা কী বলবো। ফিতরার পরিমাণ জিজ্ঞেস করলে সোজা সেঞ্চুরী করে বসেন। ঈদের নামাজ পড়ান ফিফটি পার্সেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ফিফটি পারসেন্ট মানে ডিজিটালের ডিজি বাদ দিয়ে আর কি!
ডিজিটাল বলেতে গিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজির কথা চলে আসে। এই লোকের কাহিনী আপনার না শোনাই ভালো। আমি যখন বলবো এই লোক ফাউন্ডেশনের ইমাম সম্মেলনে ব্যালে ড্যান্স করান, তখন আপনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, ব্যালে ড্যান্স! সেটা আবার কী?
আমাকে বলতে হবে, এটা আমেরিকান মেয়েদের নৃত্য।
তখন আপনি রাগত কন্ঠে জানতে চাইবেন, এই লোককে ফাউন্ডেশন থেকে তাড়ানোর প্রক্রিয়াটি কতটা অপমানজনকভাবে হয়েছে? তখন মাথা নিচু করে বলতে হবে, ডিজি এখনো আছেন বহাল তবিয়তে।  আমরা কিছুই করতে পারিনি! তারচে’ এটা আপনার না শোনাই ভালো।
এমন গুণধর ব্যক্তিদের আমরা বায়তুল মোকাররামে ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে হজম করে চলেছি খতিব। কেউ কিছু বলছি না। না আমজনতা, না আলেম-উলামা। লোক দেখানো প্রতিবাদ অবশ্য হয়েছে। সেটা না হওয়ার মতোই। আলেম-উলামারা দু’একটি বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রসব করে হালকা হয়ে গেছেন।  ভেবেছেন আমাদের আর কী করার আছে। আল্লাহপাকের কাছে নিশ্চয়ই আর জবাবদিহি করতে হবে না!
 আচ্ছা খতিব, বাংলাদেশের আলেম-উলামারা আল্লাহকে বোকা ভাবেন কিনা-এমনটি ভাবলে আমার কি  কোনো গোনাহ হবে? বোকাই যদি না ভাবতেন, তাহলে সামান্য প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করে কেমন করে ভাবেন দায়িত্ব পালন করা হয়েগেছে। বোধগুলো আমাদের মরেগেছে খতিব। আমরা বেঁচে আছি নির্বোধ জড়পদার্থের মতো। আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন না। ক্ষমা পাবার কোনো অধিকারই আমাদের নেই।
    প্রিয় খতিব!
    বায়তুল মোকাররাম, আমরা জানি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাবে সাথে এ কথাও জানি, দেশের প্রায় আড়াই লক্ষ মসজিদের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে এই বায়তুল মোকাররাম। বিশ্বাস করুন খতিব, বায়তুল মোকাররাম আজ অন্ধকার হয়ে আছে! শত শত বাল্ব জ্বালিয়েও এই অন্ধকার দূর করা যাচ্ছে না। বায়তুল মোকাররামের মতো মসজিদের মিম্বরে যদি থাকেন মেরুদন্ডহীন কেউ, তাহলে অবস্থা যা হবার, তাই হয়। হচ্ছেও।
    জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে দেশের ১৪ কোটি মুসলমানের হৃদয়ের কথাই উচ্চারিত হবার কথা। কুরআন-সুন্নাহ’র বিরুদ্ধে কোনো কিছু হলে প্রতিবাদের প্রথম আওয়াজটি ওখান থেকেই আসার কথা। আজ যখন সরকার, বুঝে হোক আর না বুঝে, সেচ্ছায় হোক আর বিদেশি মুরব্বিদের চাপে, কুরআনের নির্দেশনার বিপরীতে আইন করে  ফেলতে যাচ্ছে, বায়তুল মোকাররাম তখন নির্বিকার! আমাদের খতিব সাহেব মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। অবস্থা  দেখে মনে হচ্ছে বোমা মারলেও তার পেট থেকে এ ব্যাপারে কোনো কথা বের হবেনা!
    প্রিয় খতিব!
    কী করে পারতেন? বায়তুল মোকাররামের খতিব যুগ্মসচিব পদ-মর্যাদার সরকারি কর্মকর্তার ক্যাটাগরিতে পড়েন। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আপনি ছিলেন ব্যতিক্রম। যে কোনো সরকার কুরআন বিরোধী পদক্ষেপ নিতে চাইলে প্রথম হুংকারটি আপনিই দিয়েছেন। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মিম্বর থেকে নেমে এসেছেন পল্টনে। কী করে পারতেন? এই পবিত্র মনোবল কোথা থেকে পেতেন আপনি?
    প্রিয় খতিব!
    আজ আপনাকে মনে পড়ছে । খুব মনে পড়ছে। আজ ঠের পাচ্ছি আপনার শূণ্যতা! আপনি যখন ছিলেন, বুঝতে পারিনি কী ছিলেন। আজ  নেই যখন, বুঝতে পারছি কী হারিয়েছি।
    আপনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, আমার দেশের ‘নেতা বেশি কর্মী কম’ টাইপ ইসলামী সংগঠনগুলোর অতি অভিজ্ঞ আলেম-উলামারা আপনাকে খুব একটা মূল্যায়ন করতে রাজি হননি।  নিজেরা শুকনো রুটিতে অভ্যস্ত কিন্তু পরের ঘি’তে কাটা বাছতে আমাদের জুড়ি নেই কোনো। আপনি ছিলেন এদেশের আলেম সমাজের আস্থার জায়গা, নির্ভরতার প্রতীক, অবচেতন মানসিকতার নির্ভার মনোবল, অনেক আলেম-উলামাদের কাছেই সেটা ছিলো অজানা! আপনার ব্যক্তিত্ব ও ইমেজকে ব্যবহার করে সফলতার মুখ দেখেছেন আলেমরা। কিন্তু মুখে সেটা স্বীকার করার উদারতা দেখাতে পারেননি।  

এদেশে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পরিচালিত সরব আন্দোলনগুলোর  পেছনে আপনি ছিলেন নিরব উৎসাহদাতা। যখন দরকার ছিলোনা, পেছনে থেকে সাহস যুগিয়েছেন। যখন দরকার হয়েছে, সামনে এসে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি থেকেছেন মূল মঞ্চের বাইরে। সেখানে থেকেই যা যা করা দরকার করেছেন। আপনার নিরব সমর্থনই যে অন্যান্য লাখো কন্ঠের স্লোগানেরচে’ ছিলো শক্তিশালী, এটা যারা বোঝার, তারা ঠিকই বুঝতো। অনেকেই বুঝতেন না। জানি আজও তারা আমার সাথে একমত হতে চাইবেন না। তাতে কি! আমরা তো জানি কে কী! কার দৌড় কতটুকু।
    আমরা ব্যর্থ হয়েছি খতিব। আপনার অবর্তমানে আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্র্থ হয়েছি। আমরা আমাদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করছি। মুসলিম জাতির জাতীয় ইস্যুতেও আমরা পারিনি দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধে উঠতে। এখনো আমাদের অনেকগুলো ব্যানার। অনেকগুলো মাইক্রোফোন। দেশের মানুষ উলামাদের হাতে হাত রাখতে চায়। ঐক্যবদ্ধ হাতে। সুযোগ পায়না। কী যে হবে!
প্রিয় খতিব!
শুরুতে বলেছিলাম পরম করুণাময়ের কাছে আমাদের হয়ে সুপারিশ করতে। আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আল্লাহ’র কাছে আমাদের হয়ে ক্ষমা চাইবার দরকার নেই। আপনিও আমাদের ক্ষমা করবেন না। আমাদের শাস্তি দরকার। তা না হলে আমাদের হুশ ঠিকানায় আসবে  কেমন করে।


সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০১১

শুরু হোক তবে শোষক বিতর্ক

একাত্তরের ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। ঘোষণাটি কে দিয়েছিলেন, সেটা আমি জানিনা! তখন আমার জন্ম হয়নি। যাদের হয়েছিলো, যারা যুদ্ধ করেছেন, তারা সঠিক করে বলতে পারছেন না কিছু! কেউ বলেন অমুক তো কেউ বলেন তমুক! জানিনা কে সত্য বলছেন আর...
কাকে মিথ্যাবাদী বলি! আমরা কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে মিথ্যাবাদী বলে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করতে চাই না।

অবশ্য উচ্চ আদালত থেকে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। কেউ গ্রহণ করছেন কেউ আবার প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করছেন। আমরা সাধারণ মানুষ পরেছি মহা মুশকিলে। আমরা আমাদের ছোটভাই/বোনদের জানাতে পারছিনা কিছু! তারা যখন জানতে চাইছে, আমরা তখন জবাব দিতে পারছিনা। জবাব জানলে তো!


স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও আমরা ঐক্যমত্তে পৌঁছাতে পারিনি স্বাধীনতার ঘোষণাটি কে দিয়েছিলেন? ৫ বছর পর পর ঘোষক পরিবর্তন হন! পৃ্থিবীতে সম্ভবত আমরাই একমাত্র জাতি, যারা ৫ বছর পর পর ইতিহাস তৈরি করি!


আশ্চর্য আমাদের বিবেক! কে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে এতো পেরেশানি, কিন্তু কেনো দিয়েছিলেন, যে জন্যে দিয়েছিলেন, সেই উদ্দেশ্যটি কি সফল হয়েছে, দেশ কি সার্বিক অর্থে আত্মনির্ভর হতে পেরেছে, না পারলে কেনো পারেনি, কে দায়ী, গলদ কোথায়, শোধরানোর উপায় কি...এগুলো নিয়ে মোটেও ভাবিনা! আবার আমরা স্বপ্ন দেখি এগিয়ে যাবার!!


আর তাই আমরা ভিন্ন পথ ধরতে পারি। আমরা যারা একাত্তর পরবর্তি প্রজন্ম, আমরা ঘোষক বিতর্কে না গিয়ে অন্য বিতর্কে জড়াতে পারি। সেটা হচ্ছে শোষক বিতর্ক। স্বাধীনতার পর থেকেই তো আমরা আম জনতা শোষিত হয়ে আসছি। যাদেরকেই আমরা বিশ্বাস করেছি, ক্ষমতা দিয়েছি, আমাদের বিশ্বাসের পিঠে ছুরি বসাতে তারা কেউই ভুল করেন নি!


আমরা আমাদের বিশ্বাসের আঙুলগুলো তুলে দিয়েছি তাদের মুঠোয়, তারা মুড়িয়ে দিয়েছেন!

আমরা আমাদের আস্থার হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছি তাদের দিকে, তারা হাতটি আমাদের গুড়িয়ে দিয়েছেন!

আমরা আমাদের জীবনের ফায়সালা করবার দায়িত্ব দিয়েছি তাদের কাছে, তারা আমাদের নিয়ে দাবা খেলেছেন! তাদের চৌকস চালে আমরা এক একটি গুটি হারিয়ে গেছি পৃ্থিবী নামের বোর্ড থেকে!


আর কতো? আমরা কেনো ঘুমিয়েই কাটাবো সময়। আসুন কিছু করি। নেতারা করুন ঘোষক বিতর্ক। আমরা করি শোষক বিতর্ক। কে আমাদের কতো বেশি শোষন করার কৃ্তিত্ব দেখালেন, সেটা জরিপ করতে শুরু করি।


এতে লাভ কী?

আমাদের কোনো লাভ হোক আর না হোক, আগামী প্রজন্মের অনেক লাভ হবে। তারা আমাদের মতো মানুষ চিনতে ভুল করবেনা। ধোকা খাবেনা।

কাজটি আমরা করতে পারি। মন্দ হবেনা আশাকরি ।

শনিবার, ২৬ মার্চ, ২০১১

দেশ তুমি কার ?

যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তেমন স্বাধীনতা কি চেয়েছিলাম? আর যে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম তেমন স্বাধীনতা কী আমরা পেয়েছি?

৪০ বছর পেরিয়ে গেছে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। কিন্তু এখনো প্রশ্নটি সচেতন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে বেড়ায়, প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তে। একটি পতাকা এবং স্বতন্ত্র ভূ-খণ্ডের মাঝেই যদি আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে যাই, অথবা তৃপ্তি , তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা।


শুধু আলাদা ভূ-খন্ড ও পতাকার নামই কি স্বাধীনতা?


স্বাধীনতা মানে তো অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা। আমরা কি সেটা পারছি?

স্বাধীনতা মানে তো নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা কী পেরেছি?
তাহলে এত বিদেশ তোষণ কেন?

স্বাধীনতা মানে তো স্বয়ং সম্পূর্ণতা। আমরা কী হতে পেরেছি? তাহলে বারবার কেন আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের জন্য নির্লজ্জের মত হাত বাড়াচ্ছি বিদেশিদের দিকে?


বিজয় মানে তো পরাজয় এর গ্লানি গা থেকে ঝেড়ে ফেলা। আমরা কি সেটা করতে পেরেছি? তবে কেনো সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কাছে অসহায় আত্ম সমর্পন!


বিজয় মানে তো বীরত্বের গৌরব গাঁথা। তাহলে বারবার কেনো আমরা কাপুরুষের মত বিদেশিদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও কটুকথা হজম করে যাচ্ছি!!


কে দেবে জবাব? কার কাছে চাইবো আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর?

আওয়ামীলীগের কাছে?
বিএনপি’র কাছে?

সামরিক সরকারের শাসনামল ছাড়া বাংলাদেশের পুরোটা সময়তো পালাক্রমে এই দু'টি দলই শাসন করলো। কী দিয়েছে তারা আমাদের? কী করেছে তারা আমাদের জন্য? বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তাদের কোনো অবদান আছে কী? দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানানো ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আমাদের জন্য তারা আর কী করেছেন?


তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার প্লান-প্রোগ্রামে যে সময় ব্যয় করেন, সেই সময়টুকুই যদি দেশের জন্য দিতেন, নিঃসার্থ হয়ে, তাহলে বাংলাদেশকে কি অনেক উপরে উঠে যেত না? পরিবারতন্ত্রের খপ্পর থেকে আমরা কি কখনো মুক্তি পাবো না? পরিবারতন্ত্রের গ্যাড়াকল থেকে কবে বেরুবে আমাদের গণতন্ত্র?


দল-নিরপেক্ষ একজন সচেতন নাগরিক তো প্রশ্ন করতেই পারে বাংলাদেশ তুমি কার?

আওয়ামীলীগের?
বিএনপি’র?
অথবা আরেকটু সাহস করে বলতে পারে বাংলাদেশ তুমি কার?
খালেদা জিয়ার?
নাকি শেখ হাসিনার?

দুই

স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য আমরা ভুলে বসে আছি। ৩০ লক্ষ লোক জীবন দিয়ে এই দেশটি স্বাধীন করে এ জন্য দিয়ে যায়নি যে, আমরা যা ইচ্ছা তাই করবো। যেমন খুশি, তেমন চলবো। তারা চেয়েছিলো তাদের বাংলাদেশের মানুষগুলো মাথা উচু করে বাঁচবে। নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করবে। সর্বোপরি নিঃশর্তভাবে দেশকে ভালবাসবে। শুধুই বাংলাদেশকে। আমরা যদি সেটা করতে না পারি, তাহলে স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মাঝে ব্যবধান থাকলো কই?

২৬শে মার্চ এসেছে। প্রতি বছরই একবার করে আসে। আমাদের জানিয়ে দিতে যে, আমরা কতো বড় অকৃতজ্ঞ। আমরা সেটা গায়ে মাখি না। লজ্জা আমাদের থেকে কতো আলোক বর্ষ দূরে চলে গেছে-কে জানে! আমরা পুরুষরা লজ্জা পাইনা কারণ, লজ্জা নারীর ভূষণ! নারীরা পাইনা কারণ পুরুষের সমান অধিকারের যুগ!


আর এভাবেই নির্লজ্জতা, নিমকহারামী, অকৃতজ্ঞতা ও বেঈমানিকে নিত্য সঙ্গি করেই আমাদের অদ্ভুত জীবন চলা!!


আজব এক দেশে বাস করি আমরা। এক দেশে ছিলো এক রাজা... টাইপ দেশগুলোতেও মনে হয় এই অবস্থা নেই! এদেশে আমরা রাজাকারকেও রাষ্ট্রপতি বানাই! স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে পতাকা টানিয়ে দেই! মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে ফিরেও তাকাই না। যদি তাকাই-ও, সেটা মরার পরে! জীবিতদের শরীরে দেশদ্রোহিতার গন্ধ খুঁজি। পেয়েও যাই!। তাকে ফাসির সুসংবাদ(!) পর্যন্ত শোনাতে দ্বিধা করি না। মেজর জলিলরা, কর্ণেল তাহেররা, মুক্তিযোদ্ধারা এভাবেই যুগে যুগে আমাদের দ্বারা পুরস্কৃত হয়ে থাকেন!!!


তিন

আমরা ছিলাম পাকিস্তান নামক একটি দেশের খাদ্য। ২৪টি বছর তারা আমাদের ঘাড়ে চেপে রয়েছে তারা। লেবু চিপে রস বের করার মতো বের করে নিয়েছে আমাদের শরীরের যত রক্ত। স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত নিতে দেয়নি আমাদের! অনেকটা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটপট করছিলো তখন সাড়ে সাতকোটি বাঙালি। এই অবস্থায় রুখে দাঁড়ানো হয়ে পড়েছিলো অনিবার্য। রুখে দাঁড়ালো সোয়া সাতকোটি মানুষ।
(নিরব ও রাজাকারের আনুমানিক সংখ্যা বাদ দেয়া হলো)

২৬শে মার্চ ১৯৭১ থেকে নিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৮ মাস ২২ দিনে ৩০ লক্ষ জীবন এবং ২ লক্ষ সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেলাম সতন্ত্র একটি পতাকা, লাল-সবুজ। অথচ, যাদের জন্য আজ আমরা মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছি, তাঁরা কিন্তু ভোগছে শ্বাস কষ্টে! ফিরে তাকাবার সময় নেই আমাদের!


পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা পা হারিয়ে ঘরে বসে আছে আজ ৪০ বছর হলো। থাকুক বসে, আমাদের কী! আমরা আমাদের পায়ে সামান্য ব্যথা হলে ছুটে যাচ্ছি মাউন্ট এলিজাবেত কিংবা কিং ফাহাদে।!


বোমার বিকট শব্দে শ্রবণ ক্ষমতা হারিয়ে মানুষটি বেঁচে আছে ৩৯ বছর ধরে, মরার মতো। আমাদের কী! আমরা তো আমাদের কানের চিকিৎসায় ছুটে যেতে পারছি আমেরিকায়?

আচ্ছা আমাদের হলোটা কী?

আবার ফিরে এসেছে মার্চ। কদর বেড়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। ২৬ কে কেন্দ্রকরে মৌসুমী দেশ প্রেমিকদের চেতনা উতলে উঠবে।

কিছু ফুল দেয়া হবে
কিছু পদক বিতরণ হবে
কিছু আলোচনা সভা হবে
কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্টান হবে
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কিছু বিতর্ক হবে
এই তো!!

জীবিত থাকতে খোঁজ-খবর নেয়ার দরকার মনে না করলেও কিছু মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী বা এতিম ছেলের ধরে এনে তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে একটি তোষা শিরিণি'র প্যাকেট। যার কেতাবী নাম-মরণোত্তর।



আমার যদি ক্ষমতা থাকতো, তাহলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞেস করতাম,-


জীবিত থাকতে আমরা তোমাদের খোঁজ নিই নি! খুব যখন বাঁচতে চাইছিলে, আমরা এগিয়ে আসি নি! আর আজ,তুমি যখন নেই, আমরা তোমাকে মরণোত্তর পদক দিচ্ছি!

তুমি কি খুব খুশি হয়েছো?

আজ আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে, প্রিয় মুক্তিযুদ্ধ! প্রিয় স্বাধীনতা! তোমরা কিছু মনে করোনা। আমরা ততোটা অকৃ্তজ্ঞ না যতটা ভাবছো! আর না হোক, প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর এবং ২৬শে মার্চ তোমাদের স্মরণ করবো। কথা দিলাম।


তাতে যদি সন্তুষ্ট হতে না পারো, অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। এদেশে একটি নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, যারা আওয়ামীলীগ-বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি মার্কা রাজনৈতিক বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে নেই। যারা রাজনীতি করেনা, রাজনীতির মারপ্যাঁচও বুঝেনা। শুধু বুঝে দেশকে ভালোবাসতে হবে। শুধুই দেশকে।


এদের সংখ্যা বাড়ছে। দিনদিন বাড়ছে। একদিন তার সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যে দেশটির স্বপ্ন দেখে হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছিলো আমার ভাই। তার আগ পর্যন্ত,প্রিয় স্বাধীনতা, আমাদের ক্ষমা করে দিও