বছরখানেক আগে সিলেট প্রেসক্লাবকে ঘিরে একটি রিউমার প্রচারিত হয়েছিলো। “সিলেট প্রেসক্লাবে পাকিস্তান কর্ণার স্থাপন করা হবে।” অন্যদের কথা জানি না।খবরটি শুনে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব খুশি হয়েছিলাম। আমি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম সিলেটে কর্ণারটি তৈরি হয়ে গেলে আমি জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তাব করার চেষ্টা করবো বাংলাদেশের প্রতিটি প্রেসক্লাবে একটি করে পাকিস্তান কর্ণার তৈরি করার জন্য।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ‘প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে।’ প্রেসক্লাবে পাকিস্তান কর্ণার স্থাপিত হলে আমার দৃষ্টিতে মন্দ হতো না। আমরা এখানে নিউটন সাহেবের সূত্রের উপর আমল করার সুযোগ পেতাম।
আমরা জানি হাজিগণ মিনায় গিয়ে শয়তানের উপর পাথর নিক্ষেপ করেন। শয়তান তো অদৃশ্য। দেখা যায় না। শয়তানের শারীরিক আকৃতি ও অবস্থান নেই। তাহলে শয়তানের উপর পাথর নিক্ষেপ করা হয় কিভাবে?
যারা হজ্ব করেছেন, তারা জানেন, ওখানে তিনটি খাম্বা তৈরি করে রাখা হয়েছে। ওগুলো প্রতিকী শয়তান। হাজিগণ ওগুলোতেই পাথর মারেন।
আমরা একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম। আমরা বিজয় দেখিনি। সেই সঙ্গে আমরা পাকিস্তানি নরপশুদের পশুত্ব দেখিনি। ঐ সকল হায়েনাদের পাশবিকতাও দেখিনি। আমরা দেখিনি মানুষ কতটা পশু হলে পরে মায়ের পেটে থাকা বাচ্চাকে বেয়নেট দ্বারা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে উল্লাস করতে পারে!
আমরা তখন ছিলাম না বলে আমাদের দেখতে হয় নি বাবার সামনে তার নিষ্পাপ মেয়ের উপর পাশবিক অত্যাচারের সেই দৃশ্যগুলো।
আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা তখন ছিলাম না বলে আমরা দেখতে পাইনি পাকিস্তানি গাদ্দারেরা কতটা নীচ্ ও হিংস্র হতে পারে।
তবে যেটুকু শুনেছি, যতটুকু জেনেছি, তাতেই আমাদের মুখ ভর্তি হয়ে গেছে থুথুতে। আমরা আমাদের ঘৃণার এই থুথুগুলো জমিয়ে রাখছি। ফেলবার মত উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না। সিলেট প্রেসক্লাবে পাকিস্তান কর্ণার হতে যাচ্ছে শুনে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম আমরা।সত্যিই যদি পাকিস্তান কর্ণারটি তৈরি হতো, তাহলে আমরা সকাল-বিকাল ওখানে গিয়ে থুথু ফেলে আসতে পারতাম। মনটা হালকা হতো। যারা প্রতিবাদ করে এটি রুখে দিয়েছেন, কাজটা তারা ভাল করেন নি।
দুই
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস।
১৬ই ডিসেম্বর ২০১০ আমাদের ৩৯তম বিজয় দিবস। এর আগে আমরা ৩৮টি বিজয় উদযাপন করেছি। কিন্তু বিজয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ খুঁজে বের করার পথে পা বাড়াইনি। এই ৩৮ বছরে সম্ভবত একটি দিনও আমরা ভেবে দেখার ফুরসত পাইনি স্বাধীনতার মূল চেতনা এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যটি কী ছিল?
এই ৩৮ বছর পাকিস্তান ক্রিকেট টিমকে আমরা হাততালি দিয়ে সমর্থন দিয়েছি। একবারও আমাদের মনে হয়নি এই ক্রিকেটাররা তো তাদেরই উত্তরসূরী, যারা একাত্তুরে আমার ভাইকে হত্যা করেছিলো, লাঞ্ছিত করেছিলো আমার বোনকে।
উল্টো আমরা অনেকেই যুক্তি খাড়া করে বলেছি, রাজনীতি আর খেলাধুলাকে এক করে ফেলা উচিৎ নয়। পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ। আর মুসলিম ভাই হিসেবে আমরা পাকিস্তানকে সমর্থন করছি। একবারও আমাদের মনে হয়নি পাকিস্তান ক্রিকেট দল ইসলাম প্রচারের কাজে আসলে মুসলিম হিসেবে তাদেরকে সাপোর্ট করার না হয় যুক্তি থাকতো। খেলাধুলা তো ইসলামের কাজ নয়।
রাজনীতি ও খেলার মাঠকে আলাদা রাখার পেছনেও আমরা যুক্তি দিই। অথচ বিস্ময়করভাবে আমরা ভুলে যাই ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে টেষ্টের মর্যাদা দেয়া যায় কি না, সেটা নিয়ে যখন টেষ্ট প্লেইং ৯টি দেশের অধিনায়কদের সভা হচ্ছিলো, সেখানে কিন্তু পাকিস্তান আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
ভারত, শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ে ওয়েষ্টইন্ডিজ আমাদেরকে টেষ্ট স্ট্যাটাস দেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছিলো। বিপক্ষে ছিল অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। সাউথ আফ্রিকা ছিল নিরব।
পাকিস্তানকে জিজ্ঞেস করার পর সেদেশের অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক তার স্বভাবসূলভ ভঙ্গিমায় বা’'হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীর নখ কামড়াতে কামড়াতে বলছিলেন, “এ ব্যাপারে আমার কোনো মতামত নেই। বাংলাদেশকে টেষ্টের মর্যাদা দেয়া হলে কতটুকু কী হবে আমি বুঝতে পারছি না।
অথচ ভারতের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী আমাদের হয়ে কোমর বেঁধে তর্ক করেছেন সেদিন। তাহলে খেলাধুলার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানকে সমর্থন আমরা কোন্ যুক্তিতে করি?
তিন
৩৮ বছর পেরিয়ে গেছে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। কিন্তু এখনো যে প্রশ্নটি সচেতন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তা হচ্ছে,
যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তেমন স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? আর যে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম তেমন স্বাধীনতা কী আমরা পেয়েছি?
একটি পতাকা এবং স্বতন্ত্র ভূ-খণ্ডের মাঝেই যদি আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে যাই, তৃপ্তি পেয়ে যাই, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। কিন্তু শুধু আলাদা ভূ-খন্ড ও পতাকার নামই কি স্বাধীনতা?
স্বাধীনতা মানে তো অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা। আমরা কি সেটা পারছি?
স্বাধীনতা মানে তো নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা কী পেরেছি?
তাহলে এত ভারত তোষণ কেন?
স্বাধীনতা মানে তো স্বয়ংসম্পূর্ণতা। আমরা কী হতে পেরেছি? তাহলে বারবার কেন আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের জন্য নির্লজ্জের মত হাত বাড়াচ্ছি বিদেশিদের দিকে।
বিজয় মানে তো পরাজয় এর গ্লানি গা থেকে ঝেড়ে ফেলা। আমরা কি সেটা করতে পেরেছি? তবে কেন সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কাছে অসহায় আত্ম সমর্পন!
বিজয় মানে তো বীরত্বের গৌরব গাঁথা। তাহলে বারবার কেন আমরা কাপুরুষের মত বিদেশিদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও কটুকথা হজম করে যাচ্ছি।
কে দেবে জবাব?
কার কাছে চাইবো আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর?
আওয়ামীলীগের কাছে?
বিএনপি’র কাছে?
সামরিক সরকারের শাসনামল ছাড়া বাংলাদেশের পুরোটা সময়তো পালাক্রমে এই দুটি দলই শাসন করলো। কী দিয়েছে তারা আমাদের? কী করেছে তারা আমাদের জন্য? বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তাদের কোনো অবদান আছে কী? দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানানো ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আমাদের জন্য তারা আর কী করেছেন?
তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার প্লান-প্রোগ্রামে যে সময় ব্যয় করেন, সেই সময়টুকুই যদি দেশের জন্য দিতেন, নিঃসার্থ হয়ে, তাহলে বাংলাদেশকে কি অনেক উপরে উঠে যেত না? পরিবারতন্ত্রের গ্যাড়াকল থেকে কবে বেরুবে আমাদের গণতন্ত্র? দল-নিরপেক্ষ একজন সচেতন নাগরিক তো প্রশ্ন করতেই পারে বাংলাদেশ তুমি কার?
আওয়ামীলীগের?
বিএনপি’র?
অথবা আরেকটু সাহস করে বলতে পারে বাংলাদেশ তুমি কার?
খালেদা জিয়ার?
নাকি শেখ হাসিনার?
চার
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ৩৯ বছর আগে। মুক্তি পাইনি আজও! মুক্তি পাইনি দারীদ্র্য থেকে! মুক্তি পাইনি সামাজিক বৈষম্য থেকে! মুক্তি পাইনি সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে! আমরা ভুলে যাই স্বাধীনতা মানেই মুক্তি নয়।
আসুন আমরা বিজয়ের স্বাদ পেতে চেষ্টা করি। স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হই। ৩০ লক্ষ লোক জীবন দিয়ে এই দেশটি স্বাধীন করে এ জন্য দিয়ে যায়নি যে, আমরা যা ইচ্ছা তাই করবো। যেমন খুশি, তেমন চলবো।
তারা তো চেয়েছিলো তাদের বাংলাদেশের মানুষগুলো মাথা উচু করে বাঁচবে। নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করবে। সর্বোপরি নিঃশর্তভাবে দেশকে ভালবাসবে।
শুধুই বাংলাদেশকে।
আমরা যদি সেটা করতে না পারি, তাহলে স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মাঝে ব্যবধান থাকলো কই?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন