শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

বঙ্গবীর! পারলে ক্ষমা করে দিও

         রহস্যজনক কোনো কারণেই হবে হয়তো, আমাদের জাতীয় জীবনে ওসমানী একটি আপাঙ্ক্তেয় নাম। অন্য দশজন পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধদের নামের সাথেই পাইকারীভাবে উচ্চারিত হয় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর নামটি। আর হবে না-ই বা কেন! বঙ্গবীরকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক স্বীকার করতেই তো অনেকের আপত্তি। আজব এক দেশে বাস করি আমরা। রাজাকার হিসেবে অভিযোগ আছে, এমন লোককেও আমরা দেশের রাষ্ট্রপতির আসনে বসিয়ে দেই। চিহ্নিত রাজাকারদের সংসদে পাঠাই। এমনকি ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ লেগে থাকা পতাকাঅলা গাড়ির পর্যন্ত মালিক বানিয়ে দেই অনেক রাজাকারকে। অথচ যে লোকটি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রত্যাশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে সদর্পে চষে বেড়ালেন জুলুমের অন্ধকারে, সেই মানুষটির নাম আমরা মুছে ফেলি ইতিহাস থেকে! আবার আমরা চেষ্টা করছি ইতিহাস বিকৃতির ধারাকে রুখে দাঁড়াতে! আশ্চর্য! 

    মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস জুড়ে ওসমানী ছিলেন মাঠে। যুদ্ধ থেকে জীবন নিয়ে ফিরতে পারারচে'’ না পারাই ছিলো সেখানে সহজ। তিনি ফিরলেন। অন্ধকার জয় করেই ফিরলেন। আলোর মিছিলে আহবান জানালেন বাঙালি জাতিকে। সবাই এসে জড়ো হলো। মুক্তিপাগল মানুষ পতঙ্গপালের মতো এসে জড়ো হতে থাকলো রেসকোর্স ময়দানে। সবাই ইতিহাসের অংশ হতে চায়। স্বাধীন বাংলায় প্রথম শ্বাসটি তারা নিতে চায় আমাদের সূর্য সন্তানদের হাতে হাত রেখে। পারলে কিছু থু থুও নিক্ষেপ করতে চায় পাকিস্তানি অই পিশাচগুলোর মুখে। 
     ২৪ বছর জ্বালাতন করেছে অই পশুগুলো। তাদের বিষাক্ত ছুবলে বিক্ষত হয়েছে আমার সবুজ চত্তর। সবুজ শ্যামল প্রান্তরকে ওরা ভাসিয়ে দিয়েছে লালের বন্যায়। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ থেকে নিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, এই ৮ মাস ২২ দিনে আমাদের উপর বসিয়েছে অরা মরণ কামড়। পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন পাল্টা আঘাত হেনেছে বাঙালি জাতি। বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছে তাদের। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ লেজ সোজা করে দাঁড়িয়েছে অই পশ্চিম পাকিস্তানি কুকুরগুলো। গত ৯ মাস ওরা পাগল হয়ে গিয়েছিলো। কুত্তা যব্ পাগল হো যায়ে, তো উস্কো গুলি মারদেনি চাহিয়ে। বাঙালি জাতি উদারমনা। পাগলা কুকুরগুলোকে গুলি না করে ফিরে যাবার সুযোগ দিলো। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ভরে উঠলো কানায়-কানায়। পশ্চিম পাকিস্তানি মিলেটারীরা আজ নাকে খত্ দেবে। আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করে লেজ গুটিয়ে ফিরে যাবে যেখান থেকে এসেছিলো। লক্ষ বাঙালির পদভারে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বঙ্গবীর ওসমানী কখন আসবেন! স্বাধীন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যুদ্ধের হাল ধরেছেন বঙ্গবীর ওসমানী। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মূল বেদিত যে কেবল তাকেই মানায়। 



দুই. 

         স্বাধীন বাংলার প্রথম সূর্যটা আমাদের গ্রাস করে নিল দুরভিসন্ধির কালো মেঘ। ঝকঝকে দিবসের দুপুরটাকে মনে হতে লাগলো অস্বস্থিকর ভূতুড়ে রজনী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছিলো আমাদের প্রধান সহযোগী শক্তি। তাদের সহায়তার কথা আমরা কোনোদিনই ভুলবো না। বাঙালি অকৃতজ্ঞ জাতি নয়। যদিও দুষ্টু লোকেরা বলাবলি করেন, ভারত আমাদেরকে সাহায্য করেছিলো তার নিজের স্বার্থে। পাকিস্তান ছিলো তার দুশমন। আর দুশমনের দুশমন তো বন্ধুই হয়। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে ভারত, এটাই বড় কথা। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। 
     তবে কৃতজ্ঞতার মানে তো নিজেদের সত্তাকে বিক্রি করে দেয়া নয়। যুদ্ধের সাধারণ নিয়ম হলো পরাজিত গোষ্ঠি আত্মসমর্পণ করবে বিজয়ী কমান্ডার বা বিজয়ী দেশের নেতার কাছে। সেই অর্থে, অতি স্বাভাবিক কারণেই ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মধ্যমনি হবার কথা আমাদের ওসমানীকে। অথচ সুদূর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ওসমানীকে বাইরে রাখা হলো। নিরাপত্তাজনিত ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে অনুষ্ঠানে হাজিরই হতে দেয়া হলো না মানুষটিকে। আমার লক্ষ ভাইকে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করার পরও, আমার মা বোনদের লাঞ্চিত করার পরও, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিরাপদ, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের নিরাপত্তার অভাব? বাঙালি জাতি এর'চে জঘন্য গাঁজাখুরি যুক্তি এর আগে আর শুনে নি! 
     পরিকল্পনা অনুযায়ী হানাদার বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলেন মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল আরোরার কাছে। পরনির্ভরতা বা নিজের মাথার উপর অন্যের ছড়ি ঘুরানোর সুযোগ করে দেয়ার নতজানু একটি অধ্যায়ের মধ্যদিয়েই শুরু হলো স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা। অবজ্ঞা করা হল ওসমানীকে। অপমান করা হল বাঙালি জাতিকে। বাঙালি সত্তাকে। আর সেই অপমানের নিরব সাক্ষী হয়ে থাকলো ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। 



তিন. 

     এই ফাঁকে বলে রাখি, আমি ভারত বিদ্বেষী বা ভারত বিরোধী নই, তবে বাংলাদেশের পক্ষে। আমি আমার দেশের কথা বলবো। দেশের স্বার্থ দেখবো সবকিছুর উর্ধ্বে তুলে। আর এ কাজ করতে যেয়ে ভারত যদি সামনে পড়ে, ছেড়ে কথা বলবো কেন? আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সাহায্য করেছে। আমরা তাদের প্রতি বারবার কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে ইতিহাসের শরীর কালো পর্দা দিয়ে ঢেকে না দিলে স্বীকার তো করতেই হবে দাদারা কিন্তু বিনিময়ও একেবারে কম নেয় নি। যুদ্ধ বিধ্ব্যস্থ একটি দেশ যখন মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে চেয়েছে, ছিন্ন ভিন্ন টুকরোগুলো জড়ো করে ঘরটি আবার দাঁড় করানোর কথা ভাবছে, তখনই আমার দেশের ধ্বংসের আলামত যে সম্পদগুলো পড়েছিলো ছড়িয়ে, অন্ধের যষ্টি বা যক্ষের ধনের মত যেগুলোকে বুকে আগলে নিয়ে দেশটি পূণ:গঠন করার কথা, ভারতের শকুন দৃষ্টি পড়লো তখন। 

     আমরা জানি, ইসলামী রাষ্ট্র হলে যুদ্ধে পরাজিত দেশের সম্পদকে বলা হয় গণিমতের মাল। আমাদের ক্ষেত্রে ঘটলো বিপরীত। যুদ্ধে জয়ী হলাম আমরা। তবুও যেন আমাদের মাল হয়েগেল গণিমতের মাল! ট্রাক বোঝাই হয়ে হয়ে আমার দেশের সম্পদ চলে যেতে লাগলো অপারে। অতি কৃতজ্ঞ নেতারা আমাদের চুপ করে থাকলেন। কিছুই বললেন না। বাঁধা দিলেন না। বললেন না, এটা অন্যায়। তোমরা এটা করতে পারো না। প্রতিবাদের ঝান্ডা নিয়ে সামনে দাঁড়ালেন মেজর জলিল। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। রুখে দাঁড়ালেন তিনি। ভারতীয় অই লুঠতরাজের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন সিংহের হুংকারে। আমরা চূড়ান্ত নিমকহারামীটা করলাম তখন। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ঠুকে দেয়া হলো জলিলের বিরুদ্ধে। এমনকি বিচারে মৃত্যদন্ড পর্যন্ত দেয়া হলো জলিলকে। যে দেশটির জন্ম দেয়ার জন্য জীবন হাতে নিয়ে যুদ্ধ করলেন জলিল, যুদ্ধ করালেন তার অধীনস্থ যোদ্ধাদের, সেই দেশেই তাকে সাব্যস্থ করা হলো দেশদ্রোহী হিসেবে!
      নিমকহারামী আর কাকে বলে? 
     আমরা যারা একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম, আমরা যারা বিজয় দেখিনি, ২০১০ সালের নিঝুম কোনো দুপুরে বসে আমরা যখন অতীতের পৃষ্ঠা উল্টাই, ৩৮ বছরের খাতা খুলে বসি, তখন বড়বেশি অস্বস্থির সাথে ভাবি ... এ কোন্ দেশে বাস করছি আমরা? মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হবার পরও শুধু ভারতীয় অধিপত্যবাদ ও লুঠতরাজের প্রতিবাদ করায় মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় মেজর জলিলকে? অন্যদিকে রাজাকারদের দেয়া হয় মন্ত্রিত্ব!
      এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখবো? 



চার. 

      কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়া নেতাদের মধ্যে সব’চে অবহেলিত নাম কোনটি?
বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী, নির্ধিদ্বায় জবাব দেব আমি। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ওসমানীকে সব’চে বেশি অবমূল্যায়ন করেছে কারা? আমি বলবো, ওসমানীর জন্মভূমি সিলেটের মানুষ। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিমর্মভাবে হত্যা করার পর মেজর জিয়াউর রহমানকে মেরে ফেলার পর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী। দাঁড়িয়েছিলেন মানে জোর করে দাঁড় করানো হয়েছিলো তাঁকে। কিন্তু দেশবাসী তাকে ভোট দেয়নি। কষ্টের ব্যাপার হল আমরা সিলেটবাসীও ওসমানীকে ভোট দেইনি। সিলেটবাসীকে এ লজ্জা যুগের পর যুগ ধরে ধাওয়া করে যাবে। 

     বাংলাদেশের রাজনীতিকে যারা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখতেন বা রাখেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যাদের অবস্থান বেশ শক্ত ছিল কিংবা এখন আছে, আমরা লক্ষ্য করেছি সমসময়ই তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেটরই। প্রয়াত স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ, মরহুম এম. সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত, সংসদের চিপ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস সহিদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, সাবেক মন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরী এবং আরো অনেকে। অন্যদের কথা বাদই দিলাম। সিলেটের এই নেতারাইতো ওসমানীকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে রাজি ছিলেন না বা এখনো নন। কেন? কেন এই ওসমানী বিদ্বেষ? অথবা অবহেলা? পেশী বহুল রাজনৈতিক দলগঠন করতে পারেন নি তিনি। এটাইকি কারণ? আমাদের জাতীয় সংসদে, সবসরকারের আমলেই, জাতীয় প্রয়াত নেতাদের নিয়ে মাতামাতি হয়। অবশ্য মাত্রাতিরিক্ত মাতামাতি কখনো কখনো হাতাহাতি পর্যায়েও চলে যায়, সেটা ভিন্ন কথা।

     আমরা অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করে থাকি কখনো ওসমানীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মানটুকু জানানো হয় না।
     কেন? 
     কেন এই অকৃতজ্ঞতা?
     নিমকহারামী? 
     আমাদের জাতীয় সংসদে কালে ভাদ্রে এবং ভুলক্রমে কেউ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে ওসমানীর নাম নিলে আওয়ামীলীগ প্রতিবাদমুখর হয়। বিএনপি চুপ থাকে। কেন এমন হয়? ওসমানীর জীবনে অপরাধ তো একটাই ছিলো, বাকশাল সমর্থন করেন নি। বাকশাল সরকারে যোগ দেন নি। ক্ষোভের কারণ কি এটাই নয়? আসামীর কাঠগড়ায় আমি সিলেটবাসীকেও দাঁড় করাতে চাই। নিজেও দাঁড়াতে চাই। জিজ্ঞেস করতে চাই সিলেটবাসীকে, ওসমানীর বালাগঞ্জকে, বালাগঞ্জের মানুষকে, নিজেকে, কী করেছি আমরা তাঁর জন্য? আমরা কি আমাদের এই মহান নেতাকে মূল্যায়ন করতে পেরেছি যথাযথভাবে? আমাদের মন এত ছোট কেন? এত সংকীর্নতা কেন আমাদের? 



পাঁচ. 

      আমরা সিলেটবাসীর সৌভাগ্য যে, ওসমানীর মতো একজন ক্ষনজন্মা মানুষকে আমরা জন্ম দিতে পেরেছিলাম। আর আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, ওসমানীকে আমরা যোগ্যস্থানে স্থাপন করতে পারলাম না। না জীবিত ওসমানীকে, না মৃত ওসমানীকে। তামাম বিশ্বের মানুষ জানে বাঙালি জাতি একটু অন্যরকম। জুলুম নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করে নেয়। কিন্তু যখন দেয়ালে তাদের পিঠ ঠেকে যায়, যখন রুখে দাঁড়ায় জুলুমের বিরুদ্ধে, দাঁড়িয়ে যার অধিকারের দাবিতে, তখন আর সাফল্য না নিয়ে ঘরে ফিরে যায় না। বাহান্ন, উনশত্তর ও একাত্তর তার প্রমাণ। বিশ্বের মানুষ দেখেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে কত অদম্য সাহসিকতায় যুদ্ধ করেছে বাঙালি। তবে বিশ্ববাসী জানে আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কারিগরের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ঘোষক হিসেবে জানে জেনারেল জিয়ার নাম। 

    (এর আগেও আমি একাধিক লেখায় উল্লেখ করেছি জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য। তবে সেটিই প্রথম ঘোষণা ছিল কিনা, বির্তক সেটা নিয়ে। এ ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে একটি রায়ও দেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি আমরা বরাবরই শ্রদ্ধাশীল। উচ্চ আদালত বলেছেন, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক। আর জেনারেল জিয়া ও তার পঠিত ঘোষণায় বলেছেন আমি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। জেনারেল জিয়ার সেদিনের ভাষা ছিল এ রকম- I Major Ziaur Rahman at the direction of Bango Bondhu Sheikh Mujibur Rahman hereby declare that the independent peoples Republic of Bangladesh ..... তাহলে সমস্যা কোথায়? বঙ্গবন্ধু এবং জিয়াকে যার যার অবস্থানে রেখে মূল্যায়ন করলে তো বিতর্কেরই সুযোগ থাকে না।) 

     যে কথা বলছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা উচ্চারিত হলে বিশ্ববাসী বঙ্গবন্ধু এবং জিয়ার কথাই জানে। সেখানে ওসমানীর নাম আসে না! বিশ্বের মানুষ জানে না আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানী। আমরা সেটা জানতে দেইনি। মুখে আমরা ইতিহাস বিকৃতির কথা বলি। প্রতি পাঁচ বছর পর পর নতুন করে ইতিহাস লেখা হয়। ইতিহাসের পরিবর্তনও হয় ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে। নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। আমরা বিভ্রান্ত হই। কোন্টি সত্য আর কোন্টি বিকৃতি, আমরা ভেবে পাই না। সব’চে বেশি বিভ্রান্ত হয় কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীরা। ইতিহাসকে তাদের সামনে হাজির করা হয় ভিন্ন ভিন্ন লেবাস পরিয়ে। 

     আমরা বালাগঞ্জবাসীর চরম দুর্ভাগ্য যে, তৃতীয় বিশ্বের কাছে বালাগঞ্জের নামটি আমরা পৌছে দিতে পারতাম। সুযোগ ছিল আমাদের হাতে। বলতে পারতাম, আমাদের বালাগঞ্জ একজন ওসমানীকে জন্ম দিয়েছিলো। সেই ওসমানী ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। ওসমানীর নেতৃত্বেই মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ হয়েছিলো। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বালাগঞ্জের সন্তান বঙ্গবীর ওসমানী একটি দুর্দান্ত নাম। 
    আমরা সেটি করি নি। কেন করিনি বলতে পারবো না। ইতিহাসের আত্মভোলা ছাত্র আমরা। আমরা আমাদের বালাগঞ্জের শীতল পাঠিকে নিয়ে গর্ব করি। বিশ্ব দরবারে শীতল পাঠির জন্য বিখ্যাত হিসেবে বালাগঞ্জকে সামনে তুলে ধরি। ওসমানীকে নিয়ে গর্ব করি না। আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারিনা আমরা সেই বালাগঞ্জের মানুষ, যে মাটি একজন ওসমানীকে জন্ম দিয়েছিলো। 



ছয়. 

     সার্বিক অর্থে বড়বেশি অন্যায় করেছি আমরা ওসমানীর সাথে। অন্যায় আমরা করেই চলেছি। দু’এক দশক পরের প্রজন্মের কাছে ওসমানী নামের বিশেষ কোনো তাৎপর্য থাকবে না। তাদের কাছ এম এ জি ওসমানীর পরিচয় হবে নিছক একজন মুক্তিযোদ্ধা আর্মি অফিসার হিসেবে। ওসমানী নামের বিশেষত্ব হবে বালাগঞ্জের ওসমানীনগরের ওসমানপুর গ্রামে জন্ম নেয়া একজন সাধারণ মানুষ বলে। 

       আমার যদি সুযোগ থাকতো, তাহলে হাত জোড় করে দাঁড়াতাম আমি ওসমানীর সামনে। বলতাম, প্রিয় বঙ্গবীর! আমরা তোমাকে সম্মান জানাতে পারি নি। মৃত্যুর আগেও না, পরেও না। তোমার সাহসী নেতৃত্বে আমরা একটি ভূ-খন্ড পেয়েছি। একটি পতাকাকে আপন করে পেয়েছি। আমাদের উচিৎ ছিলো তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। উচিৎ ছিলো তোমার সম্মান ও মর্যাদা উপরে তুলে ধরা। আমরা সেটা করিনি। 
বালাগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে, 
  সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে, 
    বাংলাদেশের সকল মানুষের পক্ষ থেকে,
      তোমার বঙ্গ সন্তানদের পক্ষ থেকে,
        হে বঙ্গবীর,
          ক্ষমা চাইছি আমি। 
পারলে আমাদের ক্ষমা করে দিও। 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন