বিড়ালের সামনে মুখ খোলা সুটকির প্যাকেট রেখে যতই তাকে ওয়াজ করা হোক, ওরে বিড়াল! পরের সুটকিতে মুখ দিস না, গোনাহ হবে, দোজখের আগুনে জ্বলতে হবে, এই ওয়াজে বিড়ালের উপর কোনো আসর পড়বে না। লাঠি দিয়ে তাড়া করলে কিছু সময়ের জন্য দূরে সরে যাবে। একটু পরে আবার চলে আসবে কারণ, সুটকির গন্ধে সে আচ্ছন্ন। এ জন্য যা করতে হবে, তা হলো, সুটকিকে হেফাজতে রাখা। আর বিড়ালের সামনে সব সময় একটি ডান্ডা খাড়া করে রাখা।
ইভটিটিজং একটি পুরোনো রোগ। আগে বলা হতো বখাটেপনা, রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্যেক্ত করা, শীষ বাজানো, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা বা নোংরা বাক্য ছুড়ে দেয়া ইত্যাদি। এখন যেহেতু আমরা বাস করি ডিজিটাল বাংলাদেশে, সেজন্যে এত কথা না বলে একটু ডিজিটাল ভাষায় বলছি- ইভটিজিং। ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো আজকাল সোচ্ছার। স্কুল-কলেজের সামনে ‘ইভটিজিং কে না বলুন’ ব্যানার নিয়ে ঘন ঘন মানববন্ধন হচ্ছে। ইভটিজিং এর বিরুদ্ধে পুলিশি অ্যাকশন চোখে পড়ার মতো! দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলগামী মেয়েদের উত্যেক্ত করায় বখাটেদের প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করাচ্ছে পুলিশ। পত্রিকায় ছবি আসছে। কিন্তু রেজাল্ট আসছে না। বরং দিন দিন অবস্থা হচ্ছে আরো খারাফ। আগে শুধু মেয়েকে উত্যেক্ত করা হতো, এখন মেয়ের মাকে পর্যন্ত মেরে ফেলা হচ্ছে। রাগে,দুঃখে,ক্ষোভে,অভিমানে, লজ্জায় ভূক্তভোগি মেয়েদের অনেকেই বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। আর সরকার, প্রশাসন এবং আমরা দেশবাসী কিছুই করতে পারছি না ! ইভটিজিং দমন নয়, নির্মূলই যদি হয়ে থাকে উদ্দেশ্য, তাহলে বিক্ষিপ্তভাবে নয়, দরকার প্রপার ট্রিটমেন্ট।
ইভটিজিংক ‘না’ বলা, কান ধরে উঠবস করানো, কয়েকদিনের জন্যে জেলে নিয়ে যাওয়া অথবা হালকা পাতলা শাস্তি, এগুলো ঠিক আছে। জ্বরাক্রান্ত রোগীর মাথায় পানি ঢালা বলা যায়। জ্বরের প্রকোপ কমানোর জন্যে মাথায় পানিধারা দেয়া একটি কার্যকর পন্থা। তবে ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না এটাই জ্বরের ওষুধ নয়। সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। জ্বর কমানোর জন্য ডাক্তারের পরামর্শের ওষুধ খেতে হবে। আর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ভাইরাস নির্ণয় করার মাধ্যমে জায়গা মতো অ্যান্টিবায়োটিক ফেলতে না পারলে জ্বর তো কমবেই না, উপরন্তু টাইফয়েড-নিউমোনিয়াও হয়ে যেতে পারে।
ইভটিজিংও একধরনের ভাইরাসজনিত জ্বর। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসগুলো চিহ্নিত করা না গেলে তো কাজ হবে না। গর্তের ভেতর থেকে ইঁদুরকে তো আগে বের করতে লাগবে। গর্তে ইঁদুর রেখে মুখ বন্ধ করাকে আর যাই বলা যাক, ইঁদুর থেকে নিস্তার বলা যায় না।
ইভটিজিং কে লম্বা করে শুইয়ে পেটের ভেতর নল ঢুকিয়ে এন্ডোসকপি করা হলে এবং একই সাথে সিটিস্ক্যান এরও ব্যবস্থা করা গেলে আসল জীবাণু ধরা পড়বে। জানা যাবে রোগের উৎপত্তি কীভাবে। তারপর আমরা আমাদের রোগীকে সুস্থ করে তুলবো এবং ইভটিজিংকে পাঠিয়ে দেবো ময়নাতদন্তের জন্য। কাটাছেড়ার পর বিভিন্ন টুকরো চলে যাবে ফরেনসিক বিভাগে। তারপর ইভটিজিং এর বংশনির্মূলে আমাদের করণীয় শীর্ষক গবেষণা হতে পারে।
ইভটিজিং নামক রোগের পোস্টমর্টেম করা হলে যে ভাইরাসগুলো ধরা পড়বে বলে আমার ধারণা, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল-
(১) নৈতিক অবক্ষয় ঃ নীতি ও নৈতিক কমজুরী ছেলেদেরকে বখাটেপনার দিকে ঠেলে দেয়। নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষে আর পশুতে খুব একটা পার্থক্য থাকে না। আর পশুরা তো পশুত্ব করবেই।
(২) ফ্যামিলিগত ঢিলেমি ঃ ছেলে বড় হয়েছে অথবা মেয়ে। বাবা মা’র খেয়াল নেই। বাবা ব্যস্ত ব্যবসা-বাণিজ্যে, মা সামাজিকতায়। ছেলে মেয়ে কিভাবে বেড়ে উঠছে, স্বভাবে, চরিত্রে, চলনে, আচরণে কোনো ঘাড়তি থেকে যাচ্ছে কি না, সেটা দেখার সময় নেই তাদের। এমন ফ্যামিলির ছেলে মেয়েরাই সাধারণত নষ্ট হয়ে যায়। আর এ ক্ষেত্রে বখাটে ছেলের বাবা-মা’ও দায় এড়াতে পারেন না। বিশেষত আব্বাজান। তিনি ছেলের জন্মদাতা হয়েছেন ঠিক, কিন্তু পিতা হতে পারেন নি।
(৩) লাগামহীন সামাজিকতা ঃ ইভটিজিং এর জন্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও কম দায়ী নয়। মেয়েদের আজকাল পণ্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্ধনগ্ন নারী মডেল ছাড়া বিলবোর্ডই হয় না। বিভিন্ন পর্যায়ে নারীকে ব্যবহার করা হবে যৌন আবেদনময়ী ভঙ্গিতে, ছেলেদের মাথা ঠিক থাকবে কেমন করে?
( ৪) ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব ঃ ধর্মকে আজকাল জীবনের একটি অপশনাল পার্ট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবন থেকে বিদায় জানানো হয়েছে ধর্মকে। ধর্মীয় অনুশাসন থাকলে খোদাভীতি থাকতো। আর কারো মধ্যে খোদাভীতি থাকলে অশ্লিলতার দিকে ধাবিত হতো না।
(৫) বেকারত্ব ঃ ইভটিজিং এর জন্য বেকারত্বকেও দায়ী করা যায়। বেকার ছেলেরাই সাধারণত বখাটে হয়। হাতে কামকাজ থাকলে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ইতো পেত না। কর্মসংস্থান তৈরি করার মাধ্যমে বেকারদের কাজে লাগাতে পারলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে বলেই আমার ধারনা।
(৬) ইভটিজিং এর জন্য মেয়েদেরও কিছুটা দায়ী করবো আমি। আমি যদি পর্দার কথা বলি, বলা হবে মধ্যযোগীয়। আমি যদি বুরকার কথা বলি, বলা হবে সেকেলো। এমনকি স্কার্ফ এর কথা বললেও অতি আধুনিক ভাইজানরা তেঁতে উঠবেন। যদি বলি বুরকাপরা কতগুলো মেয়েকে ছেলেরা উত্যেক্ত করলো? জবাব পাওয়া যাবে না।
আচ্ছা ঠিক আছে। একটু শালিন পোশাক তো পরা যায়। জামাটিকে ফাসির দড়ির মতো আটোসাটো না বানিয়ে একটু লোজ করে তৈরি করলে কী হয়? কোমর পর্যন্ত না রেখে জামাটি হাটু অবদি লম্বা করলে কোনো সমস্যা তো ছিলো না। ওরনা’কে মাফলার বানানোর দরকার কী? উগ্র পোশাকে আবেদনময়ী ভঙ্গিমায় নিজেকে উপস্থাপন করলে, ইভটিজিংকে প্রত্যাখ্যান করেই বলছি, দোষকি শুধুই ছেলেদের?
দোকান খোলা রাখলে কাস্টমার তো আসবেই।
(৭) অশ্লিলতা ও বেহায়াপনা ঃ আরবিতে একটি কথা আছে ‘ইজা ফা’তাল হায়া, ফাফ্আল মা শি'’তা’। এর মানে হচ্ছে, কারো কাছ থেকে যখন লজ্জা দূরে সরে যাবে, তখন তার পক্ষে যে কোনো কিছু করাই সম্ভব। শহরের দর্শনীয় দোয়ালগুলো ভরে থাকে সিনেমার অশ্লিল পোস্টারে, বিভিন্ন হলে চলে ইংলিশ ছবি, এক টিকেটে দুই ছবি, পর্ণ ম্যাগাজিনে সয়লাব থাকে পেপার পয়েন্টগুলো, ভিডিও দোকানের থাড়িয়ায় থাকে নীল ছবির ভিসিডি-ডিভিডি ক্যাসেট, চলে অবাধ পতিতা বৃত্তি। এগুলোকে বন্ধ না করে যতই চিল্লাচিল্লি করা হোক, ইভটিজিং বন্ধ হবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না।
আমরা মনে করি ইভটিজিংকে সামাজিক ও আইনানুগ, উভয়ভাবেই রুখে দাঁড়ানো দরকার। আর এ জন্য বখাটেদের বেলায় কঠোরতার পাশাপাশি মেয়েদের শালিনতার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। মেয়েরা যখন স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে, তখন তাদের পোশাক, তাদের চলন, তাদের আচরণ এমন যেন হয়, যাতে বুঝা যায় বোনগুলো আমার পড়ালেখা করতে যাচ্ছে, ফ্যাশন শো'তে নয়। অফিস-আদালত হোক বা অন্যকোনো কাজে, মেয়েরা যখন বাইরে যাবে, তারা যেন শালিনতা ও নম্রতার সীমারেখাকে নজরে রাখে।
শেষ কথা হচ্ছে, প্রচলিত আইনে বখাটেদের বিরুদ্ধে কঠিন থেকে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহন করা দরকার। তৃতীয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম কান্ট্রি হলো আমাদের এই বাংলাদেশ। সভ্যতার মজলিসের সক্রিয় সদস্য রাষ্ট্র। আর কোনো সভ্য দেশে, মুসলিম দেশে, ইভটিজিংকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। অশ্লিলতা বেহায়াপনাও সহ্য করা যায় না
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন