নিজের ভাবমূর্তিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিলেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায়। বাংলাদেশের সাথে প্রায় হতে চলা তিস্তা চুক্তি রুখে দিলেন তিনি। তিনি প্রমাণ করলেন, পার্শবর্তীদের সাথে সুসম্পর্ক, বন্ধুত , সেটা পরে, আগে নিজের স্বার্থ, নিজের রাজ্যের মানুষের স্বার্থ । মমতার এই মানসিকতার জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। আমার দেশের ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক কুশীলবগণ কি এখান থেকে শিক্ষনীয় কিছু খোঁজে পাচ্ছেন? মনে তো হয় না!
৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফর করছেন, তখন আমার দেশের সরকারের নীতি নির্ধারনী মহলে যারা আছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম সারির চেয়ার-টেবিলগুলো যাদের স্পর্শে ধন্য হচ্ছে, মাননীয় মন্ত্রী দীপুমনি সহ পদস্থদের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান, ‘দেখাযাক কী হয়’-টাইপ ছন্নছাড়া কথাবার্তা দেশের সাধারণ মানুষকে বরাবরের মতো বিভ্রান্তিতে ফেলে রাখে। মমতা কেনো আসেননি, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, “ পশ্চিমবঙ্গের উপ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছেন বলে আসতে পারেননি! পরে কোনো এক সময় আসবেন তিনি।
আমার দেশের সহজ সরল জনগণ ভাবলো, তাহলে কী আর করা! বেচারী নিজের বাড়িতে এতো বড় একটি আয়োজন রেখে আসবেইবা কীভাবে? আমরা আর ভাবলাম না মনমোহন’র এই সফর তো আর হুট করেই অনুষ্টিত হচ্ছে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ভারত সফরের সময়ই এই ফিরতি সফর ঠিক হয়েছিলো। মমতা রাজ্য সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার আগে থেকেই জানতেন এই সফরের কথা। আর পশ্চিমবঙ্গের উপ নির্বাচনও নিশ্চই দু’পাঁচ দিনের নোটিশেই অনুষ্টিত হচ্ছে না। তাহলে কী করে বিশ্বাস করা যায় মমতার না আসার এটাই কারণ? সেই সাথে ভারতের পানি মন্ত্রীও নাই। ঘটনা কী?
মনমোহন সিংকে ঢাকায় রেখে শ্রদ্ধেয় মোজাম্মেল কবির’র কথার সূত্র ধরে কৌতূহলের বশেই ঢু মারলাম কোলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন এডিশনে। যদি কিছু জানা যায়। স্ববিস্ময়ে আবিস্কার করলাম আনন্দবাজার ফলাও করে বলছে,
“মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতেই শেষ মুহুর্তে আটকে গেলো বাংলাদেশের সাথে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি। ক্ষমতা গ্রহনের পর ১১০ দিনে এটাই মমতার সেরা চাল বলে মনে করা হচ্ছে। জলবণ্টন নিয়ে শতাংশের জটিল হিসেব বা সংখ্যাতত্ত্বকে পিছনে ফেলে তিনি সোজাসাপ্টা বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, রাজ্যের স্বার্থেই রুখে দাঁড়িয়ে তিনি চুক্তি আটকে দিয়েছেন। এই চুক্তি হলে আদতে বিপদ্......
তৃণমূল শিবিরের মতে, এটাই মূখ্যমন্ত্রীর মোক্ষম চাল এবং মোক্ষম সময়ে। যা দিয়ে গোটা পরিস্থিতিকে তিনি নিজের অনুক’লে এনে ফেলেছেন। রাজ্যের স্বার্থের মুখপাত্র হিসাবে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের পাশাপাশি বাম শিবিরকে ইষৎ বিভ্রান্তও করে দিতে পেরেছেন মমতা”
বোঝতে আর বাকী রইলো না কেনো ছিলো মমতার বেঁকে বসা! আরো খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, শুকনো মওসুমে ২৩ হাজারের পরিবর্তে ২৫ হাজার কিউসেক পানি দেয়া হবে বাংলাদেশকে, মমতাকে কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে নাকি সেটাই জানানো হয়েছিলো। কিন্তু চুক্তির খসড়া হাতে পেয়ে তিনি দেখতে পান বাংলাদেশ পাচ্ছে ৩৩ হাজার কিউসেক। বেঁকে বসেন তিনি।
যদিও ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টন হলে বাংলাদেশের ৬০ হাজার কিউসেক পানি পাবার কথা, কিন্তু যার বিজয়ে আনন্দে নৃত্য করেছিলাম আমরা আর ভাবছিলাম, পশ্চিমবঙ্গটা বুঝি আমরাই জয় করে ফেলেছি, আমাদের সেই দরদীনি মমতা পরিস্কার জানিয়ে দেন, ২৫ হাজারের একফোটা বেশি পানি দিতে তিনি রাজি নন, কখনো রাজি হবেন না। ফলে ভেস্তে যায় সবকিছু।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরো জানা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই যোগাযোগ করেছেন মমতার সাথে। ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার চিঠি নিয়ে তাঁর একজন বিশেষ দূত মমতার সাথে দেখাও করেন। হিমালয়ের বরফ গলানো সম্ভব হয়নি তবুও। মমতা সাফ জানিয়ে দেন, এমন কোনো শর্তে তিনি চুক্তি করতে পারেন না যাতে তাঁর রাজ্যে জল সংকট তৈরি হয়।
ছয় তারিখের আনন্দবাজার’র ভাষ্য অনুযায়ী, মমতা যে আসছেন না, তিস্তা চুক্তি যে হচ্ছে না, বাংলাদেশ সেটা আগে থেকেই জানতো। পত্রিকাটি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই’র বরাত দিয়ে জানায়, “ আপাতত ঠিক হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় গিয়ে জানিয়ে আসবেন অদূর ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তি করতে ভারত বদ্ধ পরির্ক ।”
তার মানে ভারত-বাংলাদেশ, উভয়েই জানতো, এই মোলাকাতে অন্তত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না। তাহলে এ নিয়ে কেনো ছিলো এতো লোকচুরি! মমতা কেনো আসছেন না-এই প্রকৃত সত্যটা জাতির সামনে প্রকাশ করতে সমস্যাটা কী ছিলো? এটা করলে তো সরকারের স্বচ্ছতাই প্রকাশ পেতো।
আমাদের প্রতি মমতার এই ভয়াবহ মমতা দেখে আমার বারবার মনে পড়তে লাগলো ছাগলের তিন বাচ্চার সেই গল্পটি। আই যে! ছাগলের দুই বাচ্চা দুধ খেয়ে লাফাচ্ছিলো আর তৃতীয়টি এমনি এমনিই তিড়িং বিড়িং করছিলো। মাস চারেক আগে মমতা যখন এক ঐতিহাসিক ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন ওখানকার দুধ খাওয়া ছাগলের বাচ্চাগুলো খুশিতে যে পরিমাণ লাফাচ্ছিলো, এখানকার আমরা, দুধ না খাওয়া অতি উৎসাহী ছাগশিশুরা লাফাচ্ছিলাম তারচে’ও কয়েকগুন বেশি! আজ যখন মূখ্যমন্ত্রী মমতা মোক্ষম সময়ে স্বরূপে আবিভূত হলেন, তিনি তাঁর দেশের প্রেক্ষাপটে রাজ্যপ্রেমের সাথে কোনো রকম আপোষে গেলেন না, তখন আমার দেশের আমরা যারা লারাচ্ছিলাম, সেই আমাদের বর্তমান চেহারাটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে আমার।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে পঞ্চাশোর্ধ অভিন্ন নদী। ভারত আছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তারা আছে উজানে। শুকনো মওসুমে আমাদের মাটি যখন একফোটা পানির জন্য খা খা করে, তখন তারা পানি আটকে রাখে। আবার বর্ষাকালে আমরা যখন বন্যার পানিতে ভাসতে থাকি, তখন তারা বাধগুলো ছেড়ে দেয়। আমাদের কিছুই করার থাকে না! যাবার কোনো জাযগাও নেই বলে। তিন দিকে ভারত একদিকে বঙ্গপোসাগর, যাবার আর জায়গা কোথায়!!
সেই ষাটের দশক থেকে আলোচনা হতে হতে অবশেষে ৯৬ সালে এসে একটি মাত্র নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিলো। যাকে আমরা অনেকেই ঐতিহাসিক গঙ্গাচুক্তি বলে গর্ব করতে ভালোবাসি। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি কখনো পেলাম কি না, সেটা দেখবার জন্য যে, বিশেষজ্ঞ হবার দরকার হয় না, শুকনো মওসুমে নদীটি’র মধ্যেখানে গিয়ে দাড়ালেই হয়, সেটা ভাববার তাগিদ কখনো অনুভূত হযনি!
ফিরে আসি তিস্তায়। তিস্তার উৎস সিকিমের কাংসে হিমবাহ। হিন্দু পুরান অনুসারে দেবী পার্বতীর স্তন থেকে তিস্তা’র উৎপত্তি! উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, তিন নদীর স্রোত মিলে তিস্তা। তিস্তা শব্দটি এসেছে ত্রি-সেরাতা বা তিন প্রবাহ থেকে। হিমালয়ের ৭২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে নদীটির সৃষ্টি হয়েছে। এটি দার্জিলিং এ অবস্থিত শিভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নদীটি নীলফামারী জেলার খড়িবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের এসে প্রবেশ করতো। ১৭৮৭ সালে এসে অতিবৃষ্টিজনিত ব্যাপক বন্যার কারণে নদীটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি হয়ে এসে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে চিলামারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষপুত্রে এসে মিলিত হয়।
৪২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীটির ১৫১ কিলোমিটার পড়েছে সিকিমে। পশ্চিমবঙ্গে ১২৩ কি:মি:। দুই রাজ্যের সীমানা বরাবর ১৯ কি:মি;। বাংলাদেশে ১২১ কি:মি:। ভারত এখন তিস্তা থেকে বছরে পানি পাচ্ছে ১১০ কিউমেক। (ঘনমিটার/সেকেন্ড) যেখানে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশ পাচ্ছে মাত্র ৩০ কিউমেক!। এটা কতবেশি দাদাগিরি সুলভ বণ্টন নীতি, ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।
মনমোহনের এই সফরে তিস্তা চুক্তি হয়নি বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ট্রানজিট চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়নি। এতে করে কিছু মানুষকে বেশ উল্লোসিত মনে হচ্ছে। তাদেরকে আমি বলতে শুনছি, কাজের কাজ হয়েছে। আমাদের জন্য তিস্তা চুক্তি করেনি, আমরাও ট্রানজিট চুক্তি করিনি। সমুচিৎ জবাব।
তবে আমরা খুতখুতে মেজাজের সাধারণ মানুষ কিন্তু খুশি হতে পারছি না। উপরন্তু ঠিক যে কারণে কিছু ভাই আমার উল্লোসিত, সেই একই কারণেই আমরা উদ্বিগ্ন! সে অনেক দীর্ঘ কথা। আগামী কিস্তিতে বিস্তারিত আলোচনার ওয়াদা থাকলো।
৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফর করছেন, তখন আমার দেশের সরকারের নীতি নির্ধারনী মহলে যারা আছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম সারির চেয়ার-টেবিলগুলো যাদের স্পর্শে ধন্য হচ্ছে, মাননীয় মন্ত্রী দীপুমনি সহ পদস্থদের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান, ‘দেখাযাক কী হয়’-টাইপ ছন্নছাড়া কথাবার্তা দেশের সাধারণ মানুষকে বরাবরের মতো বিভ্রান্তিতে ফেলে রাখে। মমতা কেনো আসেননি, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, “ পশ্চিমবঙ্গের উপ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছেন বলে আসতে পারেননি! পরে কোনো এক সময় আসবেন তিনি।
আমার দেশের সহজ সরল জনগণ ভাবলো, তাহলে কী আর করা! বেচারী নিজের বাড়িতে এতো বড় একটি আয়োজন রেখে আসবেইবা কীভাবে? আমরা আর ভাবলাম না মনমোহন’র এই সফর তো আর হুট করেই অনুষ্টিত হচ্ছে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ভারত সফরের সময়ই এই ফিরতি সফর ঠিক হয়েছিলো। মমতা রাজ্য সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার আগে থেকেই জানতেন এই সফরের কথা। আর পশ্চিমবঙ্গের উপ নির্বাচনও নিশ্চই দু’পাঁচ দিনের নোটিশেই অনুষ্টিত হচ্ছে না। তাহলে কী করে বিশ্বাস করা যায় মমতার না আসার এটাই কারণ? সেই সাথে ভারতের পানি মন্ত্রীও নাই। ঘটনা কী?
মনমোহন সিংকে ঢাকায় রেখে শ্রদ্ধেয় মোজাম্মেল কবির’র কথার সূত্র ধরে কৌতূহলের বশেই ঢু মারলাম কোলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন এডিশনে। যদি কিছু জানা যায়। স্ববিস্ময়ে আবিস্কার করলাম আনন্দবাজার ফলাও করে বলছে,
“মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতেই শেষ মুহুর্তে আটকে গেলো বাংলাদেশের সাথে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি। ক্ষমতা গ্রহনের পর ১১০ দিনে এটাই মমতার সেরা চাল বলে মনে করা হচ্ছে। জলবণ্টন নিয়ে শতাংশের জটিল হিসেব বা সংখ্যাতত্ত্বকে পিছনে ফেলে তিনি সোজাসাপ্টা বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, রাজ্যের স্বার্থেই রুখে দাঁড়িয়ে তিনি চুক্তি আটকে দিয়েছেন। এই চুক্তি হলে আদতে বিপদ্......
তৃণমূল শিবিরের মতে, এটাই মূখ্যমন্ত্রীর মোক্ষম চাল এবং মোক্ষম সময়ে। যা দিয়ে গোটা পরিস্থিতিকে তিনি নিজের অনুক’লে এনে ফেলেছেন। রাজ্যের স্বার্থের মুখপাত্র হিসাবে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের পাশাপাশি বাম শিবিরকে ইষৎ বিভ্রান্তও করে দিতে পেরেছেন মমতা”
বোঝতে আর বাকী রইলো না কেনো ছিলো মমতার বেঁকে বসা! আরো খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, শুকনো মওসুমে ২৩ হাজারের পরিবর্তে ২৫ হাজার কিউসেক পানি দেয়া হবে বাংলাদেশকে, মমতাকে কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে নাকি সেটাই জানানো হয়েছিলো। কিন্তু চুক্তির খসড়া হাতে পেয়ে তিনি দেখতে পান বাংলাদেশ পাচ্ছে ৩৩ হাজার কিউসেক। বেঁকে বসেন তিনি।
যদিও ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টন হলে বাংলাদেশের ৬০ হাজার কিউসেক পানি পাবার কথা, কিন্তু যার বিজয়ে আনন্দে নৃত্য করেছিলাম আমরা আর ভাবছিলাম, পশ্চিমবঙ্গটা বুঝি আমরাই জয় করে ফেলেছি, আমাদের সেই দরদীনি মমতা পরিস্কার জানিয়ে দেন, ২৫ হাজারের একফোটা বেশি পানি দিতে তিনি রাজি নন, কখনো রাজি হবেন না। ফলে ভেস্তে যায় সবকিছু।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরো জানা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই যোগাযোগ করেছেন মমতার সাথে। ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার চিঠি নিয়ে তাঁর একজন বিশেষ দূত মমতার সাথে দেখাও করেন। হিমালয়ের বরফ গলানো সম্ভব হয়নি তবুও। মমতা সাফ জানিয়ে দেন, এমন কোনো শর্তে তিনি চুক্তি করতে পারেন না যাতে তাঁর রাজ্যে জল সংকট তৈরি হয়।
ছয় তারিখের আনন্দবাজার’র ভাষ্য অনুযায়ী, মমতা যে আসছেন না, তিস্তা চুক্তি যে হচ্ছে না, বাংলাদেশ সেটা আগে থেকেই জানতো। পত্রিকাটি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই’র বরাত দিয়ে জানায়, “ আপাতত ঠিক হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় গিয়ে জানিয়ে আসবেন অদূর ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তি করতে ভারত বদ্ধ পরির্ক ।”
তার মানে ভারত-বাংলাদেশ, উভয়েই জানতো, এই মোলাকাতে অন্তত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না। তাহলে এ নিয়ে কেনো ছিলো এতো লোকচুরি! মমতা কেনো আসছেন না-এই প্রকৃত সত্যটা জাতির সামনে প্রকাশ করতে সমস্যাটা কী ছিলো? এটা করলে তো সরকারের স্বচ্ছতাই প্রকাশ পেতো।
আমাদের প্রতি মমতার এই ভয়াবহ মমতা দেখে আমার বারবার মনে পড়তে লাগলো ছাগলের তিন বাচ্চার সেই গল্পটি। আই যে! ছাগলের দুই বাচ্চা দুধ খেয়ে লাফাচ্ছিলো আর তৃতীয়টি এমনি এমনিই তিড়িং বিড়িং করছিলো। মাস চারেক আগে মমতা যখন এক ঐতিহাসিক ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন ওখানকার দুধ খাওয়া ছাগলের বাচ্চাগুলো খুশিতে যে পরিমাণ লাফাচ্ছিলো, এখানকার আমরা, দুধ না খাওয়া অতি উৎসাহী ছাগশিশুরা লাফাচ্ছিলাম তারচে’ও কয়েকগুন বেশি! আজ যখন মূখ্যমন্ত্রী মমতা মোক্ষম সময়ে স্বরূপে আবিভূত হলেন, তিনি তাঁর দেশের প্রেক্ষাপটে রাজ্যপ্রেমের সাথে কোনো রকম আপোষে গেলেন না, তখন আমার দেশের আমরা যারা লারাচ্ছিলাম, সেই আমাদের বর্তমান চেহারাটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে আমার।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে পঞ্চাশোর্ধ অভিন্ন নদী। ভারত আছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তারা আছে উজানে। শুকনো মওসুমে আমাদের মাটি যখন একফোটা পানির জন্য খা খা করে, তখন তারা পানি আটকে রাখে। আবার বর্ষাকালে আমরা যখন বন্যার পানিতে ভাসতে থাকি, তখন তারা বাধগুলো ছেড়ে দেয়। আমাদের কিছুই করার থাকে না! যাবার কোনো জাযগাও নেই বলে। তিন দিকে ভারত একদিকে বঙ্গপোসাগর, যাবার আর জায়গা কোথায়!!
সেই ষাটের দশক থেকে আলোচনা হতে হতে অবশেষে ৯৬ সালে এসে একটি মাত্র নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিলো। যাকে আমরা অনেকেই ঐতিহাসিক গঙ্গাচুক্তি বলে গর্ব করতে ভালোবাসি। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানি কখনো পেলাম কি না, সেটা দেখবার জন্য যে, বিশেষজ্ঞ হবার দরকার হয় না, শুকনো মওসুমে নদীটি’র মধ্যেখানে গিয়ে দাড়ালেই হয়, সেটা ভাববার তাগিদ কখনো অনুভূত হযনি!
ফিরে আসি তিস্তায়। তিস্তার উৎস সিকিমের কাংসে হিমবাহ। হিন্দু পুরান অনুসারে দেবী পার্বতীর স্তন থেকে তিস্তা’র উৎপত্তি! উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, তিন নদীর স্রোত মিলে তিস্তা। তিস্তা শব্দটি এসেছে ত্রি-সেরাতা বা তিন প্রবাহ থেকে। হিমালয়ের ৭২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে নদীটির সৃষ্টি হয়েছে। এটি দার্জিলিং এ অবস্থিত শিভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নদীটি নীলফামারী জেলার খড়িবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের এসে প্রবেশ করতো। ১৭৮৭ সালে এসে অতিবৃষ্টিজনিত ব্যাপক বন্যার কারণে নদীটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি হয়ে এসে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে চিলামারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষপুত্রে এসে মিলিত হয়।
৪২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীটির ১৫১ কিলোমিটার পড়েছে সিকিমে। পশ্চিমবঙ্গে ১২৩ কি:মি:। দুই রাজ্যের সীমানা বরাবর ১৯ কি:মি;। বাংলাদেশে ১২১ কি:মি:। ভারত এখন তিস্তা থেকে বছরে পানি পাচ্ছে ১১০ কিউমেক। (ঘনমিটার/সেকেন্ড) যেখানে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশ পাচ্ছে মাত্র ৩০ কিউমেক!। এটা কতবেশি দাদাগিরি সুলভ বণ্টন নীতি, ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।
মনমোহনের এই সফরে তিস্তা চুক্তি হয়নি বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ট্রানজিট চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়নি। এতে করে কিছু মানুষকে বেশ উল্লোসিত মনে হচ্ছে। তাদেরকে আমি বলতে শুনছি, কাজের কাজ হয়েছে। আমাদের জন্য তিস্তা চুক্তি করেনি, আমরাও ট্রানজিট চুক্তি করিনি। সমুচিৎ জবাব।
তবে আমরা খুতখুতে মেজাজের সাধারণ মানুষ কিন্তু খুশি হতে পারছি না। উপরন্তু ঠিক যে কারণে কিছু ভাই আমার উল্লোসিত, সেই একই কারণেই আমরা উদ্বিগ্ন! সে অনেক দীর্ঘ কথা। আগামী কিস্তিতে বিস্তারিত আলোচনার ওয়াদা থাকলো।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন