অনেকগুলো প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য অমীমাংসিত রেখেই বিদায় নিলেন ড. মনমোহন সিং। দু’দিন ছিলেন। আতিথেয়তায় কমতি করিনি কোনো। তিনি স্বল্পাহারি মানুষ, তবুও সাধ্যমত খাইয়েছি। বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক হিষেবে প্রাপ্য সম্মান করেছি। বিদায়বেলা দেড়শ কেজি পদ্মার ইলিশও হাদিয়া দিয়েছি। কিন্তু বহুল আলোচিত এই সফর থেকে সম্পর্কের পালে হাওয়া লাগানো ছাড়া চোখে পড়ার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা খোঁজে পাইনি আমরা। দীর্ঘ ১২ বছর পর ভারতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে নিয়ে যারা একটু বেশিই উচ্ছ্বাসিত ছিলেন, তাদেরকেও এখন মাথা নিচু করে গাইতে শুনি, স্বাদ না মিটিলো, আশা না পুরিলো......
না, আমরা নেগেটিভ সেন্স লালন করি না। এই সফর থেকে একদম কিছুই পাওয়া যায়নি বলবো না। ৪৬ টি গার্মেন্ট পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও সীমান্ত সমাঝোতা স্মারক স্বার, এগুলোকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতে চাই। যদিও দেশটির নাম যেহেতু ভারত, সেজন্য তাদের উপর আশা করতে ভরসা পাইনা আমরা। অতীত অভিজ্ঞতা তো আমাদের সুখকর নয়। পণ্যের গুণগত মান বা অন্য কোনো ঠুনকো অজুহাত তুলে আমাদের পণ্য যে বাতিল করে দেবে না, সীমান্তে যে বিএসএফ এর বর্বরতা বন্ধ হবেই, আর কোনো ফেলানীকে মেরে কাটাতারের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে না, কী গ্যারান্টি আছে?
এই সফরে আরেকটি কাজ হয়েছে। আমাদের বেরুবাড়ী ভারতের হাতে তুলে দেয়ার বিনিময়ে প্রাপ্ত দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহলে যাবার করিডোরটি ২৪ ঘন্টা খোলে দেয়ার কথা ফাইনাল হয়েছে। কীভাবে বিশ্বাস করি! এই চুক্তি তো ১৯৭৪ সালেই স্বারিত হয়েছিলো, যার সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের সংবিধান। ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে সম্পাদিত মুজিব-ইন্ধিরা চুক্তিটিকে সাংবিধানিক বৈধতা দিতেই তো আয়োজন করা হয়েছিলো তৃতীয় সংশোধনী। ২৮শে নভেম্বর ১৯৭৪ সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনীর শিরোনামটিই তো হচ্ছে-
“গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও প্রজাতন্ত্রী ভারত সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের কতিপয় বিধানের অধিকতর সংশোধন কল্পে প্রণীত আইন।”
কেমন ছিলো চুক্তি? আমাদের সংবিধানের এই অংশটি এখনো বাংলা করা হয়নি। কেনো হয়নি কে জানে। তপশীল ১৪ অংশে চুক্তির বিবরণ দেয়া হয়েছে এভাবে-
14, Benubari- India will retain the southern half of south berubari union no 12 and the adjacent cnelaves. Measuring an area of 2.64 square mils approximately. and in exchange Bangladesh will retain the Dahagram and Angarpota cnelaves. India will lease in perctuily of Bangladesh and area of 178 metres85 metres near. `Tin bigha’ of connect Dahagram with panibari Mouza (P.S. Patgram) of Bangladesh.
বাংলায় সার সংপে বোধকরি এভাবেই দাঁড়ায়; বাংলাদেশ দক্ষিণ বেরুবাড়ির দক্ষিণ অংশের ২.৬৪ বর্গমাইল ভূমি ভারত কে দেবে। এবং ভারত আমাদের দেকে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহল এবং সেখানে যাবার জন্য তিন বিঘা করিডোর। কিন্তু বিগত সাঁইত্রিশ বছর ধরে ভারত আমাদের নাকের ডগায় তিন বিঘার মূলো ঝুলিয়ে রেখেছে। যখন ইচ্ছ খুলে দিয়েছে, যখন ভালো লাগেনি বন্ধ করে দিয়েছে। তো বঙ্গবন্ধু যেখানে বিনিময় (বেরুবাড়ি) দিয়ে চুক্তি করেও তিনবিঘা করিডোর সুবিধা আদায় করে যেতে পারেননি, সেখানে বঙ্গবন্ধু কন্যা আবার নতুন করে সমঝোতা করে এবং বাহ্যিকভাবে বিনা বিনিময়ে এই ন্যায্য সুবিধা আমাদের পাইয়ে দেবেন, কী করে বিশ্বাস করি?
ভারত তিস্তা সই করেনি বলে বাংলাদেশও ট্রানজিট সই করেনি। এটি হচ্ছে একটি খবর। আর কে না জানে, খবরের ভেতরেই থাকে আসল খবর। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, সেই আমরা এই আসল খবরটি নিয়েই বেশি উদ্ভিগ্ন। আমরা খুব করে চাইছি আমাদের অনুমান যেনো সঠিক না হয়। আমাদের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা যেনো মিথ্যে প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে ভারত যে রাস্তাটি চাচ্ছে, ট্রানজিটের নামে, সেটা কোনোভাবেই ট্রানজিটের সংজ্ঞায় পড়েনা। সকলেই জানি কোনো একটি দেশ থেকে দ্বিতীয় দেশের ভেতর দিয়ে গিয়ে তৃতীয় দেশে যে রাস্তা বের হয়, সেটার নাম ট্রানজিট। আর দ্বিতীয় দেশ ঘুরে আবার নিজ দেশেরই অন্য অঞ্চলে ফিরে এলে সেটা হয় করিডোর। বহুল আলোচিত ট্রানজিট নামক রোডটির রোডম্যাপ হলো দুটি।
১, কলকাতা-রায়মন্ডল-খুলনা-বরিশাল-চাদপুর-গোয়ানন্দ-সিরাজঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারী-ধুবড়ী।
২,কলকাতা-রায়মন্ডল-বরিশাল-চাদপুর-নারায়নগঞ্জ-ভৈরব-আজমিরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমপুর।
অর্থাৎ ভারত থেকেই শুরু, ভারতে গিয়েই খতম। তারপরও সরকারের বড় বড় মাথাওয়ালারা এটিকে কোন যুক্তিতে ট্রানজিট বলেন, বুঝার কোনো কুদরত নেই।
মনমোহনের এই সফরে তিস্তাচুক্তি কেনো হয়নি? ট্রানজিটের সাথে তিস্তার কী সম্পর্ক, সেটা অনুমান করবার জন্য প্রাসঙ্গিক কিছু কথা সামনে আসা দরকার।
১) তিস্তার আলোচনা কিন্তু হুট করে সামনে আসেনি। গত বিশ মাস থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চুক্তিটির খসড়া তৈরি করা হয়েছিলো, তাহলে শেষ বিকেলে এসে গোলমাল বাঁধবে কেনো?
২) কী ছিলো চুক্তির খসড়ায়? কেউ জানে না। গোটা জাতিকে অন্ধকারে রেখেই চুক্তিটি হতে যাচ্ছিলো। মন্ত্রীসভায় আলোচনা হলো না। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে হয়ে গেলো, সেখানেও এ নিয়ে টু শব্দটি নেই। এমনকি আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়ামের সভায়ও তো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারতো। মন্ত্রী-এমপিদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলতেন জানি না। পাল্টা প্রশ্ন, জানে কে? তাও জানি না! আর এই সুযোগটি তো করে দিয়েছে আমাদের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ১৪১ ক ধারায় বলা আছে,
‘‘ বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’’
এই যে, সংবিধান সংশোধন নিয়ে এতো জল ঘোলা করা হলো। কই! কাউতেই তো ১৪১ ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠাতে দেখলাম না! কেউ বললেন না, চুক্তি সম্পাদিত হয়ে যাবার পর সেটা আর সংসদে পেশ করার দরকার কি? করলে তো আগে করা দরকার। তবেই না দেশের স্বার্থে আলাপ- আলোচনার অবকাশ থাকে। কাউকে বলতে শোনা গেলো না এখানে সম্পাদিত’র স্থলে সম্পাদনাধীন শব্দটি প্রতিস্থাপিত হোক। এই ধারার কাধে বন্দুক রেখেই তো বিদেশের সাথে দেশের স্বার্থ বিরোধী চুক্তিগুলো হয়ে যায়। জনগণকে অন্ধকারে রেখে।
সরকারি সূত্রে জানানো হলো চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী বাংলাদেশ পাচ্ছে ৪৮ শতাংশ পানি। ভারত ৫২ শতাংশ। কিন্তু মমতা বেঁকে বসার মুহুর্তে বললেন, আমাকে জানানো হয়েছিলো বাংলাদেশকে দেয়া হচ্ছে ২৫ হাজার কেউসেক কিন্তু চূড়ান্ত খসড়া হাতে আসার পর দেখতে পেলাম সেখানে লেখা ৩৩ হাজার কিউসেক। আমি ২৫ হাজারের এক ফোটা বেশি দিতেও রাজি নই।
মাথা ভনভন করতে শুরু করলে। মমতা বলছেন তিনি জানতেন ২৩ এর স্থলে ২৫। চুক্তিতে দেখতে পান ৩৩। সরকার জানালো চুক্তিতে ছিলো ৪৮%। এই ২৩, ২৫, ৩৩ ও ৪৮ এর গ্যাড়াকলে পড়ে আমাদের অবস্থা.........? কে মিথ্যাবাদী সেটা না হয় জানতে চাইলাম না। কিন্তু কে সত্যবাদী, সেটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই?
৩) ভারতীয় মিডিয়া যেখানে আগের দিনই নিশ্চিত করেছিলো মমতার অসম্মতির কারণে তিস্তাচুক্তি হচ্ছে না। সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৬ তারিখেও বলতে শুনলাম , চুক্তি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি জেনে গোপন করেছিলেন না জানতেনই না। যদি না জেনে থাকেন, তাহলে ঘন ঘন বিদেশ সফর করা ছাড়া আপার আর কাজটা কী? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে তাঁকে কে বলেছে? আর জেনে করলে নি:সন্দেহে জাতির সাথে মশকারা করা। কেনো করলেন জানবার অধিকার আছে আমাদের।
৪) বাঁশ থেকে যদি কঞ্চি মোটা হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ‘ডালমে কুচ কালা হায়’। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন ড. মনমোহন সিং। তিনি গোটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গসহ। আর দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি কাজ করতে চান কিন্তু তাঁরই দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে তারই অধিনস্থ একজন মুখ্যমন্ত্রীর সদয় সম্মতি না থাকায় এটা করতে পারেননি, আফসোস সে কথাও আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়।
৫) যেহেতু তিস্তার সাথে মমতার পশ্চিমবঙ্গ জড়িত, তাহলে আমার দেশের সরকারের মাথামোটা উপদেষ্টাদের একবারও কেনো মনে হলো না কেন্দ্র সরকারের সাথে সাথে ব্যপারটি নিয়ে রাজ্য সরকার তথা মমতার সাথেও কথা বলা দরকার। আবার ইস্যুটি যেহেতু রাজনৈতিক। তাই উপদেষ্টা নামের সাবেক এই আমলাদের দায়িত্ব দেয়ার আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একবারও কেনো মনে হলো না এই কাজ আমলাদের না, এটা রাজনীতিবিদদের। ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে করা গঙ্গা চুক্তির কারিগরদের মধ্যে এক আব্দুস সামাদ আজাদ না হয় নেই কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সি এম শফি সামি’রা তো বেঁচে আছেন। তাদেরকে কি কাজে লাগানো যেত না?
এবার আসি মূল পয়েন্টে। তিস্তার পানি আমাদের অতি ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারত আমাদের পানি দিতে বাধ্য। কিন্তু দিচ্ছে না গায়ের জোরে। আর ট্রানজিট? সেটা ঐচ্ছিক, তারা আমাদের কাছে এই সুবিধাটুকু চাইছে। ট্রানজিট দিতে বাধ্য নই আমরা। আমরা আমাদের দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে ইচ্ছে করলে দেবো না হলে নাই।
অথচ আমরা গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সাথে ল্য করছি তিস্তা ও করিডোরকে পরিকল্পিতভাবে সমান্তরাল করে ফেলা হচ্ছে! মনমোহনের এই সফরের শুরুতে অতি সুক্ষ্মভাবে বাজারজাত করা হলো, তিস্তা চুক্তি হচ্ছেই। তিস্তা চুক্তি না হলে ট্রানজিট চুক্তিও করা হবে না। সফরের মধ্যেখানে জানানো হলো, ভারত তিস্তা সই করেনি বলে বাংলাদেশও ট্রানজিট সই করেনি। সফর শেষে বিদায়বেলা মনমোহন তিস্তা চুক্তি করতে না পারায় বেজায় মন খারাপ ভাব প্রকাশ করে বললেন, অচিরেই এটি হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা জানালেন, তিন মাসের মধ্যেই তিস্তা সই হতে যাচ্ছে। কী প্রমাণ হয???
ভারত আমাদের তিস্তার পানি দেয়নি বলে আমরাও ট্রানজিট দেইনি। জনগণকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই ম্যাসেজটি দেয়া হলো, তার মানে তিস্তা দিলে ট্রানজিটও দিয়ে দেয়া হতো। তার মানে তিস্তা সমান ট্রানজিট! আসলেই কি তাই? ট্রানজিট অতি স্পর্শকাতর একটি ব্যাপার। আমরা ট্রানজিটের বিরোধী নই। বর্তমান বিশ্বের হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তবে সেটা তো ট্রানজিটই হতে হবে। কানেকটিভিটির দরকার আছে। কিন্তু ট্রানজিটের নামে তো আর করিডোর দেয়া যায় না। বলবেন ট্রানজিট, দেবেন করিডোর, এটা কেনো?
কথা তো আরো আছে। মানলাম আমরা ভারতকে করিডোর দিতে রাজি হয়েছি। এবারে দেখবার বিষয় হলো, প্রস্তাবিত( অথবা বিএপির অভিযোগ অনুযায়ী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরেই স্বারিত) ট্রানজিটের স্বরূপ কেমন? কেমন সেটার প্রকৃতি? কেমন হবে তার প্রয়োগরীতি? সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে দায়িত্বহীন অসংলগ্ন ও পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা ছাড়া ভরসা করবার মতো কোনো তথ্য পাওয়া তো মুশকিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে প্রশ্ন করলে যে জবাব পাওয়া যাবে, তাতে মনে হবে, সামনের শনি-মংগলবারেই বুঝি সব ঝামেলা চুকে যাবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেবেন, ট্রানজিট দেবার জন্য নতুন করে আর কোনো চুক্তিরই প্রয়োজন নেই। ৭২ এর চুক্তিই যথেষ্ট। আর আমাদের মুহতারাম পানিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তো আরেক ধাপ আগ বেড়ে বলে দেবেন, ভারত আমাদের যেটুকুন পানি দিচ্ছে, তাই তো যথেষ্ট। তাহলে সঠিক তথ্য আর পাবেন কোথায়?
বিভিন্ন সূত্র থেকে যেটুকুন জানা গেছে, ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে অবাধে চলার সুযোগ পাবে। কোনো চেকিং করা যাবে না! আমরা জানতে চাইতে পারবো না কী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! আমরা দেখতে চাইতে পারবো না ভেতরে ক’ আছে- আলু নাকি পটল? চিনি না ফেন্সিডিল? নাকি উত্তর পূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী( তাদের ভাষায় বিচ্ছিন্নতাবাদী) সেভেন সিস্টারকে সাইজ করবার জন্য হাতিয়ার? একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এরচে’ বেশি খতরনাক আর কী হতে পারে?
সবকিছু মাথায় রেখে মনমোহনের এই সফরে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ প্রযোজনায় একটি নাটক মঞ্চস্থ হলো কিনা-সেটা নিশ্চিত হতে আরো কয়েক মাস অপো করতে লাগবে। তবে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে ট্রানজিটকে হালাল করার জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবেই এই নাটকটি মঞ্চায়ন করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তিস্তা সই করে গোপনে ট্রানজিট দিয়ে বলাহবে, আমরা কথা রেখেছি। তিস্তা আদায় করে তবেই ট্রানজিট দিয়েছি।
তিস্তার প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখেই বলছি, ট্রানজিট ও তিস্তাকে এক পাল্লায় মাপার কোনো সুযোগ নেই। আমরা পানি চাই। অবশ্যই চাই। এটা আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য। কিন্তু তার বিনিময়ে ট্রানজিট কোনো শর্ত হতে পারে না। অথচ পরিকল্পনা মাফিক সেটাই করা হচ্ছে। জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকে এই জায়গায় এনে সেট করা হচ্ছে যে, তারা তিস্তা সই করেনি আমরা ট্রানজিট দেইনি, তারা দিলে আমরা দিতাম। এরই ধারাবাহিকতায়, আমরাদের ধারণা আগেই বলেছি, কামনা করছি মিথ্যা হোক, নামকাওয়াস্তে তিস্তা চুক্তি করে ট্রানজিট হালাল করা হয়ে যাবে জনগণকে বোঝানো হবে আমরা আমাদের দাবি আদায় করে তবেই ট্রানজিট দিয়েছি।
আমরা আমাদের সরকারকে বলি, আত্মঘাতি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ভারত যদি গায়ের জোরে তিস্তার পানি না দেয়, না দিক, প্রয়োজনে আমরা ১৬ কোটি মানুষ আমাদের চোখের পানি দিয়েই তিস্তার প্রবাহ সচল রাখবো তবুও আমরা চাইবো না আমাদের বুকের উপর দিয়ে ইন্ডিয়ান ট্রাক চলুক । সরকারকে আমরা বিনয়ের সাথে বলি, ট্রানজিটের ব্যপারে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসা ঠিক হবে না। এর সাথে দেশের ষোল কোটি মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। এদেশের মানুষ আপনাদের ভোট দিয়েছে আপনাদের নির্বাচনি ইশতেহার দেখে। খোলে দেখুন, সেখানে কিন্তু ট্রানজিটের কথা বলা নেই। এখন ভারতকে ট্রানজিট দিতে চাইলে আবার জনগণের ম্যান্ডেট নিন। গণভোটের ব্যবস্থা করুন। দেখুস দেশের মানুষ কী চায়?
আর ঠান্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখুন দুশমন বাড়ানোর খুব বেশি দরকার আছে কি না। আজ যারা, যে ভারতীয়রা তাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছে, আজ থেকে ৪০ বছর আগে, ঊনিশ শ একাত্তর সালে এই মানুষগুলোও কিন্তু তাদের থালার ভাত শেয়ার করেছিলো আমাদের সাথে। আজ যখন তারা লড়ছে, এটাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যপার বলে আমরা না হয় চুপ করে থাকলাম যেমন আছি। কিন্তু আমাদের বাড়ি ব্যবহার করে তাদের বুকে গুলি চালানোর পথ করে দিয়ে তাদের টার্গেটে পরিণত হবো কেনো? কেনো তাদের শত্র“তে পরিণত হবো? শত্র“র কি আমাদের এতই অকাল পড়েছে যে, নতুন করে শত্র“ বানাতে হবে? আর ভারতের মতো বন্ধু খাকতে শত্র“র আর দরকারইবা কি!
না, আমরা নেগেটিভ সেন্স লালন করি না। এই সফর থেকে একদম কিছুই পাওয়া যায়নি বলবো না। ৪৬ টি গার্মেন্ট পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও সীমান্ত সমাঝোতা স্মারক স্বার, এগুলোকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতে চাই। যদিও দেশটির নাম যেহেতু ভারত, সেজন্য তাদের উপর আশা করতে ভরসা পাইনা আমরা। অতীত অভিজ্ঞতা তো আমাদের সুখকর নয়। পণ্যের গুণগত মান বা অন্য কোনো ঠুনকো অজুহাত তুলে আমাদের পণ্য যে বাতিল করে দেবে না, সীমান্তে যে বিএসএফ এর বর্বরতা বন্ধ হবেই, আর কোনো ফেলানীকে মেরে কাটাতারের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে না, কী গ্যারান্টি আছে?
এই সফরে আরেকটি কাজ হয়েছে। আমাদের বেরুবাড়ী ভারতের হাতে তুলে দেয়ার বিনিময়ে প্রাপ্ত দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহলে যাবার করিডোরটি ২৪ ঘন্টা খোলে দেয়ার কথা ফাইনাল হয়েছে। কীভাবে বিশ্বাস করি! এই চুক্তি তো ১৯৭৪ সালেই স্বারিত হয়েছিলো, যার সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের সংবিধান। ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে সম্পাদিত মুজিব-ইন্ধিরা চুক্তিটিকে সাংবিধানিক বৈধতা দিতেই তো আয়োজন করা হয়েছিলো তৃতীয় সংশোধনী। ২৮শে নভেম্বর ১৯৭৪ সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনীর শিরোনামটিই তো হচ্ছে-
“গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও প্রজাতন্ত্রী ভারত সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের কতিপয় বিধানের অধিকতর সংশোধন কল্পে প্রণীত আইন।”
কেমন ছিলো চুক্তি? আমাদের সংবিধানের এই অংশটি এখনো বাংলা করা হয়নি। কেনো হয়নি কে জানে। তপশীল ১৪ অংশে চুক্তির বিবরণ দেয়া হয়েছে এভাবে-
14, Benubari- India will retain the southern half of south berubari union no 12 and the adjacent cnelaves. Measuring an area of 2.64 square mils approximately. and in exchange Bangladesh will retain the Dahagram and Angarpota cnelaves. India will lease in perctuily of Bangladesh and area of 178 metres85 metres near. `Tin bigha’ of connect Dahagram with panibari Mouza (P.S. Patgram) of Bangladesh.
বাংলায় সার সংপে বোধকরি এভাবেই দাঁড়ায়; বাংলাদেশ দক্ষিণ বেরুবাড়ির দক্ষিণ অংশের ২.৬৪ বর্গমাইল ভূমি ভারত কে দেবে। এবং ভারত আমাদের দেকে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহল এবং সেখানে যাবার জন্য তিন বিঘা করিডোর। কিন্তু বিগত সাঁইত্রিশ বছর ধরে ভারত আমাদের নাকের ডগায় তিন বিঘার মূলো ঝুলিয়ে রেখেছে। যখন ইচ্ছ খুলে দিয়েছে, যখন ভালো লাগেনি বন্ধ করে দিয়েছে। তো বঙ্গবন্ধু যেখানে বিনিময় (বেরুবাড়ি) দিয়ে চুক্তি করেও তিনবিঘা করিডোর সুবিধা আদায় করে যেতে পারেননি, সেখানে বঙ্গবন্ধু কন্যা আবার নতুন করে সমঝোতা করে এবং বাহ্যিকভাবে বিনা বিনিময়ে এই ন্যায্য সুবিধা আমাদের পাইয়ে দেবেন, কী করে বিশ্বাস করি?
ভারত তিস্তা সই করেনি বলে বাংলাদেশও ট্রানজিট সই করেনি। এটি হচ্ছে একটি খবর। আর কে না জানে, খবরের ভেতরেই থাকে আসল খবর। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, সেই আমরা এই আসল খবরটি নিয়েই বেশি উদ্ভিগ্ন। আমরা খুব করে চাইছি আমাদের অনুমান যেনো সঠিক না হয়। আমাদের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা যেনো মিথ্যে প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে ভারত যে রাস্তাটি চাচ্ছে, ট্রানজিটের নামে, সেটা কোনোভাবেই ট্রানজিটের সংজ্ঞায় পড়েনা। সকলেই জানি কোনো একটি দেশ থেকে দ্বিতীয় দেশের ভেতর দিয়ে গিয়ে তৃতীয় দেশে যে রাস্তা বের হয়, সেটার নাম ট্রানজিট। আর দ্বিতীয় দেশ ঘুরে আবার নিজ দেশেরই অন্য অঞ্চলে ফিরে এলে সেটা হয় করিডোর। বহুল আলোচিত ট্রানজিট নামক রোডটির রোডম্যাপ হলো দুটি।
১, কলকাতা-রায়মন্ডল-খুলনা-বরিশাল-চাদপুর-গোয়ানন্দ-সিরাজঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারী-ধুবড়ী।
২,কলকাতা-রায়মন্ডল-বরিশাল-চাদপুর-নারায়নগঞ্জ-ভৈরব-আজমিরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমপুর।
অর্থাৎ ভারত থেকেই শুরু, ভারতে গিয়েই খতম। তারপরও সরকারের বড় বড় মাথাওয়ালারা এটিকে কোন যুক্তিতে ট্রানজিট বলেন, বুঝার কোনো কুদরত নেই।
মনমোহনের এই সফরে তিস্তাচুক্তি কেনো হয়নি? ট্রানজিটের সাথে তিস্তার কী সম্পর্ক, সেটা অনুমান করবার জন্য প্রাসঙ্গিক কিছু কথা সামনে আসা দরকার।
১) তিস্তার আলোচনা কিন্তু হুট করে সামনে আসেনি। গত বিশ মাস থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চুক্তিটির খসড়া তৈরি করা হয়েছিলো, তাহলে শেষ বিকেলে এসে গোলমাল বাঁধবে কেনো?
২) কী ছিলো চুক্তির খসড়ায়? কেউ জানে না। গোটা জাতিকে অন্ধকারে রেখেই চুক্তিটি হতে যাচ্ছিলো। মন্ত্রীসভায় আলোচনা হলো না। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে হয়ে গেলো, সেখানেও এ নিয়ে টু শব্দটি নেই। এমনকি আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়ামের সভায়ও তো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারতো। মন্ত্রী-এমপিদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলতেন জানি না। পাল্টা প্রশ্ন, জানে কে? তাও জানি না! আর এই সুযোগটি তো করে দিয়েছে আমাদের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ১৪১ ক ধারায় বলা আছে,
‘‘ বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’’
এই যে, সংবিধান সংশোধন নিয়ে এতো জল ঘোলা করা হলো। কই! কাউতেই তো ১৪১ ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠাতে দেখলাম না! কেউ বললেন না, চুক্তি সম্পাদিত হয়ে যাবার পর সেটা আর সংসদে পেশ করার দরকার কি? করলে তো আগে করা দরকার। তবেই না দেশের স্বার্থে আলাপ- আলোচনার অবকাশ থাকে। কাউকে বলতে শোনা গেলো না এখানে সম্পাদিত’র স্থলে সম্পাদনাধীন শব্দটি প্রতিস্থাপিত হোক। এই ধারার কাধে বন্দুক রেখেই তো বিদেশের সাথে দেশের স্বার্থ বিরোধী চুক্তিগুলো হয়ে যায়। জনগণকে অন্ধকারে রেখে।
সরকারি সূত্রে জানানো হলো চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী বাংলাদেশ পাচ্ছে ৪৮ শতাংশ পানি। ভারত ৫২ শতাংশ। কিন্তু মমতা বেঁকে বসার মুহুর্তে বললেন, আমাকে জানানো হয়েছিলো বাংলাদেশকে দেয়া হচ্ছে ২৫ হাজার কেউসেক কিন্তু চূড়ান্ত খসড়া হাতে আসার পর দেখতে পেলাম সেখানে লেখা ৩৩ হাজার কিউসেক। আমি ২৫ হাজারের এক ফোটা বেশি দিতেও রাজি নই।
মাথা ভনভন করতে শুরু করলে। মমতা বলছেন তিনি জানতেন ২৩ এর স্থলে ২৫। চুক্তিতে দেখতে পান ৩৩। সরকার জানালো চুক্তিতে ছিলো ৪৮%। এই ২৩, ২৫, ৩৩ ও ৪৮ এর গ্যাড়াকলে পড়ে আমাদের অবস্থা.........? কে মিথ্যাবাদী সেটা না হয় জানতে চাইলাম না। কিন্তু কে সত্যবাদী, সেটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই?
৩) ভারতীয় মিডিয়া যেখানে আগের দিনই নিশ্চিত করেছিলো মমতার অসম্মতির কারণে তিস্তাচুক্তি হচ্ছে না। সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৬ তারিখেও বলতে শুনলাম , চুক্তি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি জেনে গোপন করেছিলেন না জানতেনই না। যদি না জেনে থাকেন, তাহলে ঘন ঘন বিদেশ সফর করা ছাড়া আপার আর কাজটা কী? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে তাঁকে কে বলেছে? আর জেনে করলে নি:সন্দেহে জাতির সাথে মশকারা করা। কেনো করলেন জানবার অধিকার আছে আমাদের।
৪) বাঁশ থেকে যদি কঞ্চি মোটা হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ‘ডালমে কুচ কালা হায়’। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন ড. মনমোহন সিং। তিনি গোটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গসহ। আর দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি কাজ করতে চান কিন্তু তাঁরই দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে তারই অধিনস্থ একজন মুখ্যমন্ত্রীর সদয় সম্মতি না থাকায় এটা করতে পারেননি, আফসোস সে কথাও আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়।
৫) যেহেতু তিস্তার সাথে মমতার পশ্চিমবঙ্গ জড়িত, তাহলে আমার দেশের সরকারের মাথামোটা উপদেষ্টাদের একবারও কেনো মনে হলো না কেন্দ্র সরকারের সাথে সাথে ব্যপারটি নিয়ে রাজ্য সরকার তথা মমতার সাথেও কথা বলা দরকার। আবার ইস্যুটি যেহেতু রাজনৈতিক। তাই উপদেষ্টা নামের সাবেক এই আমলাদের দায়িত্ব দেয়ার আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একবারও কেনো মনে হলো না এই কাজ আমলাদের না, এটা রাজনীতিবিদদের। ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে করা গঙ্গা চুক্তির কারিগরদের মধ্যে এক আব্দুস সামাদ আজাদ না হয় নেই কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সি এম শফি সামি’রা তো বেঁচে আছেন। তাদেরকে কি কাজে লাগানো যেত না?
এবার আসি মূল পয়েন্টে। তিস্তার পানি আমাদের অতি ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারত আমাদের পানি দিতে বাধ্য। কিন্তু দিচ্ছে না গায়ের জোরে। আর ট্রানজিট? সেটা ঐচ্ছিক, তারা আমাদের কাছে এই সুবিধাটুকু চাইছে। ট্রানজিট দিতে বাধ্য নই আমরা। আমরা আমাদের দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে ইচ্ছে করলে দেবো না হলে নাই।
অথচ আমরা গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সাথে ল্য করছি তিস্তা ও করিডোরকে পরিকল্পিতভাবে সমান্তরাল করে ফেলা হচ্ছে! মনমোহনের এই সফরের শুরুতে অতি সুক্ষ্মভাবে বাজারজাত করা হলো, তিস্তা চুক্তি হচ্ছেই। তিস্তা চুক্তি না হলে ট্রানজিট চুক্তিও করা হবে না। সফরের মধ্যেখানে জানানো হলো, ভারত তিস্তা সই করেনি বলে বাংলাদেশও ট্রানজিট সই করেনি। সফর শেষে বিদায়বেলা মনমোহন তিস্তা চুক্তি করতে না পারায় বেজায় মন খারাপ ভাব প্রকাশ করে বললেন, অচিরেই এটি হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা জানালেন, তিন মাসের মধ্যেই তিস্তা সই হতে যাচ্ছে। কী প্রমাণ হয???
ভারত আমাদের তিস্তার পানি দেয়নি বলে আমরাও ট্রানজিট দেইনি। জনগণকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই ম্যাসেজটি দেয়া হলো, তার মানে তিস্তা দিলে ট্রানজিটও দিয়ে দেয়া হতো। তার মানে তিস্তা সমান ট্রানজিট! আসলেই কি তাই? ট্রানজিট অতি স্পর্শকাতর একটি ব্যাপার। আমরা ট্রানজিটের বিরোধী নই। বর্তমান বিশ্বের হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তবে সেটা তো ট্রানজিটই হতে হবে। কানেকটিভিটির দরকার আছে। কিন্তু ট্রানজিটের নামে তো আর করিডোর দেয়া যায় না। বলবেন ট্রানজিট, দেবেন করিডোর, এটা কেনো?
কথা তো আরো আছে। মানলাম আমরা ভারতকে করিডোর দিতে রাজি হয়েছি। এবারে দেখবার বিষয় হলো, প্রস্তাবিত( অথবা বিএপির অভিযোগ অনুযায়ী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরেই স্বারিত) ট্রানজিটের স্বরূপ কেমন? কেমন সেটার প্রকৃতি? কেমন হবে তার প্রয়োগরীতি? সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে দায়িত্বহীন অসংলগ্ন ও পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা ছাড়া ভরসা করবার মতো কোনো তথ্য পাওয়া তো মুশকিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে প্রশ্ন করলে যে জবাব পাওয়া যাবে, তাতে মনে হবে, সামনের শনি-মংগলবারেই বুঝি সব ঝামেলা চুকে যাবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেবেন, ট্রানজিট দেবার জন্য নতুন করে আর কোনো চুক্তিরই প্রয়োজন নেই। ৭২ এর চুক্তিই যথেষ্ট। আর আমাদের মুহতারাম পানিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তো আরেক ধাপ আগ বেড়ে বলে দেবেন, ভারত আমাদের যেটুকুন পানি দিচ্ছে, তাই তো যথেষ্ট। তাহলে সঠিক তথ্য আর পাবেন কোথায়?
বিভিন্ন সূত্র থেকে যেটুকুন জানা গেছে, ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে অবাধে চলার সুযোগ পাবে। কোনো চেকিং করা যাবে না! আমরা জানতে চাইতে পারবো না কী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! আমরা দেখতে চাইতে পারবো না ভেতরে ক’ আছে- আলু নাকি পটল? চিনি না ফেন্সিডিল? নাকি উত্তর পূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী( তাদের ভাষায় বিচ্ছিন্নতাবাদী) সেভেন সিস্টারকে সাইজ করবার জন্য হাতিয়ার? একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এরচে’ বেশি খতরনাক আর কী হতে পারে?
সবকিছু মাথায় রেখে মনমোহনের এই সফরে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ প্রযোজনায় একটি নাটক মঞ্চস্থ হলো কিনা-সেটা নিশ্চিত হতে আরো কয়েক মাস অপো করতে লাগবে। তবে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে ট্রানজিটকে হালাল করার জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবেই এই নাটকটি মঞ্চায়ন করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তিস্তা সই করে গোপনে ট্রানজিট দিয়ে বলাহবে, আমরা কথা রেখেছি। তিস্তা আদায় করে তবেই ট্রানজিট দিয়েছি।
তিস্তার প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখেই বলছি, ট্রানজিট ও তিস্তাকে এক পাল্লায় মাপার কোনো সুযোগ নেই। আমরা পানি চাই। অবশ্যই চাই। এটা আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য। কিন্তু তার বিনিময়ে ট্রানজিট কোনো শর্ত হতে পারে না। অথচ পরিকল্পনা মাফিক সেটাই করা হচ্ছে। জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিকে এই জায়গায় এনে সেট করা হচ্ছে যে, তারা তিস্তা সই করেনি আমরা ট্রানজিট দেইনি, তারা দিলে আমরা দিতাম। এরই ধারাবাহিকতায়, আমরাদের ধারণা আগেই বলেছি, কামনা করছি মিথ্যা হোক, নামকাওয়াস্তে তিস্তা চুক্তি করে ট্রানজিট হালাল করা হয়ে যাবে জনগণকে বোঝানো হবে আমরা আমাদের দাবি আদায় করে তবেই ট্রানজিট দিয়েছি।
আমরা আমাদের সরকারকে বলি, আত্মঘাতি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ভারত যদি গায়ের জোরে তিস্তার পানি না দেয়, না দিক, প্রয়োজনে আমরা ১৬ কোটি মানুষ আমাদের চোখের পানি দিয়েই তিস্তার প্রবাহ সচল রাখবো তবুও আমরা চাইবো না আমাদের বুকের উপর দিয়ে ইন্ডিয়ান ট্রাক চলুক । সরকারকে আমরা বিনয়ের সাথে বলি, ট্রানজিটের ব্যপারে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসা ঠিক হবে না। এর সাথে দেশের ষোল কোটি মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। এদেশের মানুষ আপনাদের ভোট দিয়েছে আপনাদের নির্বাচনি ইশতেহার দেখে। খোলে দেখুন, সেখানে কিন্তু ট্রানজিটের কথা বলা নেই। এখন ভারতকে ট্রানজিট দিতে চাইলে আবার জনগণের ম্যান্ডেট নিন। গণভোটের ব্যবস্থা করুন। দেখুস দেশের মানুষ কী চায়?
আর ঠান্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখুন দুশমন বাড়ানোর খুব বেশি দরকার আছে কি না। আজ যারা, যে ভারতীয়রা তাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছে, আজ থেকে ৪০ বছর আগে, ঊনিশ শ একাত্তর সালে এই মানুষগুলোও কিন্তু তাদের থালার ভাত শেয়ার করেছিলো আমাদের সাথে। আজ যখন তারা লড়ছে, এটাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যপার বলে আমরা না হয় চুপ করে থাকলাম যেমন আছি। কিন্তু আমাদের বাড়ি ব্যবহার করে তাদের বুকে গুলি চালানোর পথ করে দিয়ে তাদের টার্গেটে পরিণত হবো কেনো? কেনো তাদের শত্র“তে পরিণত হবো? শত্র“র কি আমাদের এতই অকাল পড়েছে যে, নতুন করে শত্র“ বানাতে হবে? আর ভারতের মতো বন্ধু খাকতে শত্র“র আর দরকারইবা কি!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন