এই মূহুর্তে টক অব দ্য কান্ট্রি হচ্ছে সংবিধান সংশোধন। ইতোমধ্যে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল মর্মে উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান পূণ:মূদ্রণের কাজ শুরু হয়ে গেছে। সংবিধান সংশোধন কমিটি বসে আছে রিলাক্স মোডে। আর কমিটির বর্তমান কথাবার্তায় যেটুকুন বুঝা যা”ছে, তাতে পূণ:মূদ্রিত সংবিধানে আর সংশোধনী আনার দরকার হবে বলেও মনে হয় না। আদালতের কাধে বন্দুক রেখেই যদি শীকার করে নেয়া যায়, আসল মকসুদ পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আর খামাখা কষ্ট করার দরকার কী?
তবুও আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের মহান সংসদ সদস্যদের মাঝে এই বোধটুকু জেগে উঠবে, সংবিধান সংশোধন করার অধিকার সংসদের। দেশের মানুষ তাদেরকে সংসদে পাঠিয়েছে দেশ পরিচালনার জন্যে। দেশ পারচালনার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে সংবিধান। এই সংবিধানে কী থাকবে আর কী থাকবে না, দেশবাসীর চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে সেটা ঠিক করবেন সাংসদরা। আর এটা করতে যেয়ে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, ভুল-ভ্রান্তি করলে জনগনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, অন্তত আর না হলেও প্রতি ৫ বছর পর পর। আর সংবিধান সংশোধনের মতো কাজগুলোও যদি আমাদের সাংসদরা করতে না পারেন, তাহলে তাদের গণ-পদত্যাগ করা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে।
সংবিধান সংশোধনীর মাসআলায় আদালতকে ব্যবহার করা ঠিক হয় নি, মোটেও ঠিক হয় ন্।ি এটা আদালতের দায়িত্ব না। আদালতের কাজ হলো সংবিধানের কোনো বিষয়ে জটিলতা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ধারার ব্যাখা দেয়া। এতে করে আদালতকে বিতর্কিত করা হলো কি না-সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েও বলা যায়. এতে করে দেশের মানুষের আর জবাব চাওয়ার সুযোগ থাকলো ন্।া বিচার বিভাগ জবাবদিহিতার উর্দ্ধে। সেই সঙ্গে ভয়ে ভয়ে বলি, আদালতকেই যদি সংবিধান সংশোধনের কর্তৃপক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে তো আগামীতে অন্য কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা না পেলেও সংবিধানে হাত দেবার ছোট্ট একটা পথ খোলা থেকেই যাবে। কারণ এখনকার মাননীয় বিচারপতিদের কাছে যেটা সঠিক মনে হচ্ছে, আগামীর বিচারপতিদের কাছে সেটা তো সঠিক মনে নাও হতে পারে। আর এমনটি তো আমরা এদেশে হতেও দেখেছি। আর এটা হতেই পারে। দিলের মালিক তো আল্লাহ। কখন কার দিল কোন দিকে ঘুরিয়ে দেন, তিনিই জানেন। অন্তত দেশের প্রখ্যাত আইনজীবি ব্যরিষ্টার রফিকুল হকের(বাংলাদেশের কোর্ট হাওয়া বুঝে রায় দেয়) কথায় যদি সত্যতা থেকে থাকে, তাহলে আগামীতে কখন কী হয় কে জানে!
১। পঞ্চম সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা সম্ভব কি না?
২। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব কিংবা উচিৎ কি না?
৩। সংবিধানে বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম ও মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের কথা থাকবে কি না?
৪। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত আসবে?
৫। আমাদের জাতিসত্ত্বা ও নাগরিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে সৃষ্ট ঝামেলার সমাধান কেমন হবে?
৬। ৭০ অনুচ্ছেদের বেলায় নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা হবে কি না?
৭। জরুরী বিধান থাকবে কি না?
৮। তত্ত্বাবাধয়ক সরকার প্রসঙ্গে চিন্তা-ভাবনা কেমন ?
৯। অবৈধ ক্ষমতাদখল বন্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
১০। সর্বোপরি জাতীয় সংবিধান সত্যিকার অর্থেই জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠবে কি না?
এই বিষয়গুলো এবং আরো যেগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার। বিষয়গুলোর অনেক গভীরে প্রবেশ করে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ও অনুভূতির কথা মাথায় রেখে কাজ করা দরকার। সেই সঙ্গে মনে রাখা দরকার এদেশের শতকরা ৮৮ জন মানুষই মুসলমান। পৃথিবীবাসীর কাছে বাংলাদেশের পরিচয় দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে। খোদ আমেরিকাও স্বীকার করে বাংলাদেশ একটি মডারেট মুসলিম কান্ট্রি।
বিষয়গুলো নিয়ে সু-শীল শ্রেণীর বুদ্ধিজীবিরা পরামর্শ দেবেন। আমরা সাধারণ জনগণ যেভাবে
ভাবছি-
দুই \
সরকারের মাননীয় আইনমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য দায়িত্বশীল মন্ত্রীবর্গ বলে চলেছেন বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ আরেকটু এডভান্স হয়ে বলে দিচ্ছেন হাইকোর্টের রায়ে ৫ম সংশোধনী অবৈধ হয়ে যাওয়ায় সংবিধান সংশোধনেরই আর দরকার নেই। বাহাত্তরের সংবিধান অটোমেটিক জিন্দা হয়ে উঠেছে। অবশ্য সবকথায় কান দিতে নেই। সেই সুযোগও নেই। আইনমন্ত্রী বলছেন, বাহাত্তরে ফিরে যেতে কোনো সমস্যা নেই। বিশেষত ৫ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়ে যাবার পর। আওয়ামলীগেরই আরেক সিনিয়র নেতা ওবায়দুল কাদের বলছেন, ৫ম সংশোধনীর পুরোটা বাতিলের সুযোগ নেই। আর সরাসরি এবং হুবহু বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়াও যাবে না। অন্যদিকে বাহাত্তরের সংবিধানের ফজিলত বর্ণনা করে করে পেরেশন হয়ে গেছেন আওয়ামীলীগেরই আরেক সিনিয়র নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাহাত্তরের জন্য সবচে’ উচু গলায় তিনিই আওয়াজ দিচ্ছেন।
১৯৭২ সালে আওয়ামীলীগের ততকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হুসেনের নেতৃত্বে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন এই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। অথচ মজার ব্যাপার হলো, যে বাহাত্তরের জন্য আজ সুরঞ্জিত দা এত লাফালাফি করছেন, সেই মূল সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সই করার পরও এই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কিন্তু সই করেন নি। অনেকগুলো ধারার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বেরিয়ে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সই করার পরও সুরঞ্জিত বাবুর সই না করার অর্থ বঙ্গবন্ধুকে অপমান করা। তেমন একজন মানুষকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান করলেন কোন্ বিশ্বাসে, সত্যিই আমাদের মাথায় ঢুকে না। উনার মর্জি মোয়াফিক সবকিছু না হলে এবারেও যে তিনি সই না করে বেরিয়ে যাবেন না, কী গ্যারান্টি আছে?
তো সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীবর্গের পরস্পর বিরোধী মন্তব্যে আমরা সাধারণ জনগণ পড়েছি বিভ্রান্তিতে। আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কে সত্য বলছেন আর কে ...
আর এ জন্য আমরা আমাদের নিজের মতো করে ভেবে দেখতে চেষ্টা করছি বাহাত্তরের সংবিধানে আসলেই ফিরে যাওয়া সম্ভব কি না। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া মানে আমরা যা বুঝি, সবগুলো সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়া। এবারে প্রশ্ন দেখা দেবে সবগুলো সংশোধনী বাতিল করা কি সম্ভব? সেই ক্ষমতা কি আমাদের আছে? বিশেষত তৃতীয় সংশোধনীর কী হবে? তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমেই তো আমরা আমাদের বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। যদিও তার বিনিময়ে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহল এবং সেখানে যাবার জন্য তিনবিঘা করিডোর পাবার কথা ছিলো আমাদের। আমরা পাইনি। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু বাহাত্তরে ফেরৎ যেতে হলে তৃতীয়টি রেখে বাকী সংশোধনীগুলো বাতিল করলে তো হবে না। আবার তৃতীয় সংশোধনী বাতিল করা মানে তো ভারতের পেট থেকে আমাদের বেরুবাড়ি বের করে নিয়ে আসা। এটা কি সম্ভব? সরকারের ভেতরে/বাইরে এমন কেউ কি আছেন, যার এই সৎ সাহস বা দুঃসাহস আছে যে, তিনি বুকে হাত রেখে বলতে পারেন, হ্যাঁ ভারতের কাছ থেকে আমরা আমাদের বেরুবাড়ি উদ্ধার করে ছাড়বো? যদি না পারেন, তাহলে তো ৩য় সংশোধনী বাতিল করা যাবে না। আর সেটা করতে না পারলে বাহাত্তরে যাওয়া যাবে কেমন করে?
সমস্যা তো এখানেই শেষ নয়, বাহাত্তরের মূল সংবিধানের চার মুলনীতির অন্যতম একটি মূল নীতি ছিল সমাজতন্ত্র। বর্তমান আওয়ামীলীগই তো এখন মুক্ত বাজার অর্থনীতির চর্চা করছে। তাহলে সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে প্রতিস্থাপিত করা হবে কেমন করে? তাছাড়া আওয়ামীলীগই তো এখন আর সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলে না। এই মাসআ’লায় কী করা হবে?
তিন \
সংবিধানে বিস্মিল্লাহ থাকবে কি থাকবে না-এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরতীহীনভাবে বলে চলেছেন সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম থাকছে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। দেশের ৮৮% মানুষ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চাইছে। কিন্তু একাধিক মন্ত্রী-এমপি যখন আবার বলেন সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, তখন আবার দেশের মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে।
আমাদের কথা হলো, সংবিধানের শুরুতে যদি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লেখা থাকে, যদি আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথাগুলো অপরিবর্তনীয় থাকে, যেমনটি থাকবে বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তাহলে তো সেই সংবিধান আর ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধান হলো না। বিসমিল্লাহর পক্ষের সংবিধানই থাকলো। সেই সঙ্গে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ কর্র্তৃক ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়েছিলো ইসলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তায় আমরা যদি আস্থা রাখতে পারি, তাহলে এই ধারাও থাকছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে একটি শব্দ ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতা’ নিয়ে এত জল ঘোলা করার দরকার কী? দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের অনুভূতির মাত্রার পরীক্ষা নেয়ারই বা কী প্রয়োজন? সোজাসাপ্টা কেন বলে দেয়া যাচ্ছে না সংবিধানের ধর্ম-নিরপেক্ষতা যুক্ত হচ্ছে না।
চার \
ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হচ্ছে। আবার ধর্মীয় রাজনীতি থাকছে। দু’টিই সরকারি ভাষ্য। তবে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, বিশেষত ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো আশ্বস্থ হতে পারে এই ভেবে যে, শেষোক্ত মন্তব্যটি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সরকারের অতি উৎসাহি বাঘাবাঘা কিছু নেতা ঢাকঢুল পিটিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হচ্ছে। আমার জানামতে পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই যে ধর্মে শান্তি শৃঙ্খলা ও পরমত সহিষ্ণুতার কথা বলা হয়নি। একজন মানুষের ভেতরে যে মানবিকতা ও সুস্থ বিবেকবোধ থাকে, তা অই ধর্মীয় অনুভূতির কারণে। এই অনুভূতি যতক্ষণ জাগ্রত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই মানুষ সমাজের জন্য কল্যাণকর হোক আর না হোক, অন্তত সহনীয় থাকবে। আর যখন এই অনুভূতিটুকু থাকবে না, তখন সেই মানুষ আর পশুতে কোনো ব্যবধান আর থাকবে না।
যারা বলছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া দরকার, তাদেরকে বলি, বিবেক না থাকলে কারো কাছ থেকে ধার করে এনে চিন্তা করুন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যে কারো রাজনীতি করার অধিকার আছে। কে কোন্ আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করবে, সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার।
সমস্যা হচ্ছে অস্পষ্টতা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলবার আগে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দাঁড় করানো উচিৎ ছিলো। পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বলতে কী বুঝানো হবে?
যদি বলা হয় নামের মধ্যে আরবি শব্দ থাকতে পারবে না, তাহলে সমস্যা আওয়ামীলীগেরও আছে। আওয়াম আরবি শব্দ। যদি বলা হয় রাজনীতিতে আল্লাহ রাসুল বা ইসলাম শব্দ মুখে আনা যাবে না, আহলে তো এটা হবে আত্মঘাতি ব্যাপার। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও পরিপন্থী। ভুলে গেলে তো হবে না, ৭ই মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণটি, জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’।
বিশেষত একজন মুসলমানের ক্ষেত্রে একজন মুসলমান রাজনীতি করবে অথচ সে তার রাজনৈতিক মঞ্চে, কর্মকান্ডে আল্লাহর নাম নিতে পারবে না, রাসূলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে পারবে না, অন্যকে অনুপ্রাণিত হতে বলতে পারবে না, একজন হিন্দুলোক রাজনীতির মাঠে তার ভগবানের কথা বলতে পারবে না-এটা কেমন কথা? আমাদের সংবিধানের ৪১ এর ১ এর ক’ তে বলা আছে “প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে।” আমাদের জিজ্ঞাস্য হলো, এই ধারাটি কি বাদ দিয়ে দেয়া হবে?
যদি বলা হয় ধর্ম প্রচারে বাধা নেই। বাধার প্রশ্ন আসবে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার প্রসঙ্গে। এই যদি হয় অভিযোগ, তাহলে তো অবস্থা হবে আরো জটিল। প্রথমে নির্ণয় করতে লাগবে ধর্মের প্রচার কাকে বলে আর ব্যবহার কাকে বলে? রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করাকেই যদি রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার বুঝানো হয়, তাহলে এই কাজ তো আওয়ামীলীগ-বিএনপিও করে। সকল দলই কিছু না কিছু করে। বিশেষত নির্বাচনের সময়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি নির্বাচনের আগে হেজাব-তসবীহ ব্যবহার করেন নি? বেগম খালেদা জিয়া কি নির্বাচনের আগে কখনো উমরা মিস করেন? এরশাদ সাহেবের মাথা থেকে কি টুপি নামে?
এছাড়া রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের তরতাজা উদাহরণ তো হাতের কাছেই আছে। চট্টগ্রাম এম এ হান্নান বিমান বন্দরকে বিএনপি করেছিলো হযরত শাহ আমানত (র.) বিমান বন্দর। পাল্টা অ্যাকশন হিসেবে আওয়ামীলীগ জিয়া বিমান বন্দরকে করেছে হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দর। তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্য কারা ব্যবহার করে? পরিষ্কার বলা দরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বলতে কী বুঝানো হবে? একজন মুসলমানকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান পালনের অঙ্গকার করেই মুসলমান হতে হয়। রাজনীতি ও তো জীবনের একটা ক্ষেত্র। এখন বাংলাদেশের একজন মুসলমান কী করবে? আল্লাহর হুকুম মানবে নাকি সুরঞ্জিত বাবুদের? কথায় কথায় ইউরোপ-আমেরিকার উদাহরণ টানা হয়। আমাদের নেতারা কি দেখছেন না ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের সবগুলো গণতান্ত্রিক দেশেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আছে। অবশ্য ধর্মীয় রাজনীতি মানে যদি হয় ইসলামী রাজনীতি, তাহলে ভিন্ন কথা।
আদালতের রায়ের উপর আমল করে পঞ্চম সংশোধনী হুবহু বাতিল করে দিলে আওয়ামীলীগের দলীয় পরিচয়ই অসাংবিধানিক হয়ে যাবে কি না ভেবে দেখবার বিষয়। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মানে চতুর্থ সংশোধনী বহাল। আর ২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তো দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় বাকশাল গঠন করা হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি, সামরিক শাসনের বৈধতা দেয়াসহ অনেকগুলো মন্দ দিক হয়তো ছিলো। কিন্তু ভুলেগেলে তো হবে না বহুদলীয় রাজনীতি সাংবিধানিক বৈধতাও পেয়েছিলো পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে। ১৯৭৫ এর ৮ নভেম্বর এক ঘোষণার মাধ্যমে বাকশাল বাতিল হয়েছিলো যা ৫ম সংশোধনীর অন্তর্ভূক্ত। এখন যদি ৫ম সংশোধনী পুরোপুরি অবৈধ ছিলো বলে মেনে নিতে হয়, তাহলে অবধারিতভাবেই স্বীকার করতে হবে ২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ এর পর থেকে ২০১০ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ-বিএনপি তথা বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল অবৈধভাবে রাজনীতি করেছে। এখন দেখবার বিষয় আমাদের সংবিধান সংশোধন কমিটি কী করেন? ৫ম সংশোধনীর কোন্ অংশ বাতিল করেন আর কোন্ অংশ রাখেন। দেখবার বিষয় গ্রহণ বর্জনের মাপকাঠিটি কী হয়?
দুই \
বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ আরেকটু এডভান্স হয়ে বলে দিচ্ছেন সুপ্রিমকোর্টের রায়ে ৫ম সংশোধনী অবৈধ হয়ে যাওয়ায় সংবিধান সংশোধনেরই আর দরকার নেই। বাহাত্তরের সংবিধান অটোমেটিক জিন্দা হয়ে উঠেছে। বাহাত্তরের সংবিধানের ফজিলত বর্ণনা করে করে পেরেশন হয়ে গেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাহাত্তরের জন্য সবচে’ উচু গলায় তিনিই আওয়াজ দিচ্ছেন। ১৯৭২ সালে আওয়ামীলীগের তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হুসেনের নেতৃত্বে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন এই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। অথচ মজার ব্যাপার হলো, যে বাহাত্তরের জন্য আজ সুরঞ্জিত দা এত লাফালাফি করছেন, সেই মূল সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সই করার পরও এই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কিন্তু সই করেন নি। অনেকগুলো ধারার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বেরিয়ে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সই করার পরও সুরঞ্জিত বাবুর সই না করার অর্থ বঙ্গবন্ধুকে অপমান করা। তেমন একজন মানুষকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান করলেন কোন্ বিশ্বাসে, সত্যিই আমাদের মাথায় ঢুকে না। উনার মর্জি মোয়াফিক সবকিছু না হলে এবারেও যে তিনি সই না করে বেরিয়ে যাবেন না, কী গ্যারান্টি আছে? এই সুরঞ্জিত বাবু অতি স¤প্রতি হুংকার ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, এদেশে কাউকে ধর্মীয় রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। পরিস্কার ইঙ্গিত ইসলামী রাজনীতিওয়ালাদের দিকে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আল্লাহ পাক দেশের ইসলাম প্রিয় মুসলমানকে উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে আরো শান্তিতে ঘুমানোর তৌফিক দান করুন। সকলে বলুন- আমীন।
বাহাত্তরের সংবিধানে আসলেই ফিরে যাওয়া সম্ভব কি না। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া মানে আমরা যা বুঝি, সবগুলো সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়া। এবারে প্রশ্ন দেখা দেবে সবগুলো সংশোধনী বাতিল করা কি সম্ভব? সেই ক্ষমতা কি আমাদের আছে? বিশেষত তৃতীয় সংশোধনীর কী হবে? তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমেই তো আমরা আমাদের বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। যদিও তার বিনিময়ে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা সিটমহল এবং সেখানে যাবার জন্য তিনবিঘা করিডোর পাবার কথা ছিলো আমাদের। আমরা পাইনি। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু বাহাত্তরে ফেরৎ যেতে হলে তৃতীয়টি রেখে বাকী সংশোধনীগুলো বাতিল করলে তো হবে না। আবার তৃতীয় সংশোধনী বাতিল করা মানে তো ভারতের পেট থেকে আমাদের বেরুবাড়ি বের করে নিয়ে আসা। এটা কি সম্ভব? সরকারের ভেতরে/বাইরে এমন কেউ কি আছেন, যার এই সৎ সাহস বা দুঃসাহস আছে যে, তিনি বুকে হাত রেখে বলতে পারেন, হ্যাঁ, ভারতের কাছ থেকে আমরা আমাদের বেরুবাড়ি উদ্ধার করে ছাড়বো? যদি না পারেন, তাহলে তো ৩য় সংশোধনী বাতিল করা যাবে না। আর সেটা করতে না পারলে বাহাত্তরে যাওয়া যাবে কেমন করে? মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় কি একটু বুঝিয়ে বলবেন?
তিন \
সংবিধানে বিস্মিল্লাহ থাকবে কি থাকবে না-এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। যদিও চার মূলনীতির অন্যতম নীতি-সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের কথাই যদি ছাটাই করে দেয়া হয়, তাহলে বিসমিল্লাহ তাকলেই কি আর না থাকলেই কি? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরতীহীনভাবে বলে চলেছেন সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম থাকছে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। দেশের ৮৮% মানুষ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চাইছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তার কথা রাখবেন, জাতির সাথে প্রতারণা করবেন না, পরে এমন কোনো কথা বলবেন না যে, আমি কী করবো? আদালতের রায়ের বাইরে আমি যাই কী করে! আমি তো আর আইনের উর্দ্ধে নই-আপাতত এই ভরসা রাখা ছাড়া উপায় কী?
আসলে উড়ে এসে জুড়ে বসা (ওবায়দুল কাদের এর ভাষায় আওয়ামীলীগেরচে’ বড় আওয়ামীলীগার) কিছু রাজনৈতিক বসন্তবাদীরা সরকারকে বিভ্রান্ত করছেন। এরা সংখ্যায় খুবই কম । সারা জীবন এতিমের মতো মাইবাপহীন রাজনীতি করা অই জ্ঞানপাপী লোকগুলো হঠাৎ করে আওয়ামীলীগের অনুকম্পায় মস্ত্রী-এমপি হয়ে এখন রীতিমতো ধরাকে সরা ভাবতে শুরু করেছেন। অল্প জলের মাছ হঠাৎ বেশি জলের নাগাল পেয়ে গেলে ছটপটানিটা যেমন একটু বেশি করে, এক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। এই লোকগুলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যত তাড়াতাড়ি চিহ্ণিত করতে পারবেন, ততই মঙ্গল। দেশের জন্যও, উনার নিজ দল আওয়ামীলীগের জন্যেও।
চার \
ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হচ্ছে। আবার ধর্মীয় রাজনীতি থাকছে। দু’টিই সরকারি ভাষ্য। আর এই ইস্যুতে মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় সবচে বেশি পেরেশান। দিনে এক কথা বলেন তো রাতে অন্য কথা। তবে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, বিশেষত ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো আশ্বস্থ হতে পারে এই ভেবে যে, শেষোক্ত মন্তব্যটি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। আমার জানামতে পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই যে ধর্মে শান্তি শৃঙ্খলা ও পরমত সহিষ্ণুতার কথা বলা হয়নি। একজন মানুষের ভেতরে যে মানবিকতা ও সুস্থ বিবেকবোধ থাকে, তা অই ধর্মীয় অনুভূতির কারণে। এই অনুভূতি যতক্ষণ জাগ্রত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই মানুষ সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে। আর যখন এই অনুভূতিটুকু থাকবে না, তখন সেই মানুষ আর পশুতে কোনো ব্যবধান আর থাকবে না।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলবার আগে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দাঁড় করানো উচিৎ ছিলো। পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বলতে কী বুঝানো হবে? যদি বলা হয় নামের মধ্যে আরবি শব্দ থাকতে পারবে না, তাহলে সমস্যা আওয়ামীলীগেরও আছে। ‘আওয়াম’ আরবি শব্দ। যদি বলা হয় রাজনীতিতে আল্লাহ রাসুল বা ইসলাম শব্দ মুখে আনা যাবে না, তাহলে তো এটা হবে আত্মঘাতি ব্যাপার। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও পরিপন্থী। ভুলেগেলে তো হবে না, ৭ই মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ধর্মীয় অনুভূতিকেই ব্যবহার করেছিলেন । জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’।
যদি বলা হয় ধর্ম প্রচারে বাধা নেই। বাধার প্রশ্ন আসবে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার প্রসঙ্গে। এই যদি হয় অভিযোগ, তাহলে তো অবস্থা হবে আরো জটিল। প্রথমে নির্ণয় করতে লাগবে ধর্মের প্রচার কাকে বলে আর ব্যবহার কাকে বলে? রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করাকেই যদি রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার বুঝানো হয়, তাহলে এই কাজ তো আওয়ামীলীগ-বিএনপিও করে। সকল দলই কিছু না কিছু করে। বিশেষত নির্বাচনের সময়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি নির্বাচনের আগে হেজাব-তসবীহ ব্যবহার করেন নি? বেগম খালেদা জিয়া কি নির্বাচনের আগে কখনো উমরা মিস করেন? এরশাদ সাহেবের মাথা থেকে কি টুপি নামে?
কথায় কথায় ইউরোপ-আমেরিকার উদাহরণ টানা হয়। আমাদের নেতারা কি দেখছেন না ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের সবগুলো গণতান্ত্রিক দেশেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আছে। ধর্ম নিরপেক্ষতার সবক যেখান থেকে নেয়া হয়েছে, সেই ভারতে যতগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আছে, আমাদের দেশে ততটি রাজনৈতিক দলই আছে কি না- সন্দেহ। ভারতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বার বার বাষ্ট্র পরিচালনাও করছে। তাহলে .......? অবশ্য ধর্মীয় রাজনীতি মানে যদি হয় ইসলামী রাজনীতি, তাহলে ভিন্ন কথা।
পাঁচ \
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাপারে বাস্তবমুখি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন। ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনিত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।” এই ধারাটি একই সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ৩৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।’ ৩৯ এর ২ এর ক’ তে গিয়ে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের...নিশ্চয়তা দান করা হইল।”
যিনি সংসদ সদস্য, তিনিও তো একজন সম্মানিত নাগরিক। উনারও তো নিজস্ব বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। তিনি এমপি হয়েছেন বলে নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত হবেন, এটা তো হতে পারে না। এখন সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত মত প্রকাশ ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর অধিকার রাখেন। আবার ৭০ অনুচেছদের কারণে বাধাগ্রস্থ হন।
বিষয়টির যৌক্তিক শুরাহা হওয়া দরকার। যদি মনে করা হয় একটি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচিত হওয়া মানে নিজের বিবেক-বুদ্ধিকে সংশ্লিষ্ট দলের কাছে ৫ বছরের জন্য বন্ধক রেখে দেয়া, তাহলে ৩৯ অনুচ্ছেদের সাথে এই কথাগুলোও যুক্ত করে দেয়া দরকার....“তবে শর্ত থাকে যে, তিনি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচিত এমপি হন, তাহা হইলে তিনি এই মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত হইবেন।” আর যদি মনে করা হয় সকল নাগরিকেরই স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার থাকা দরকার, তাহলে ৭০ অনুচ্ছেদটি সংবিধান থেকে বিলুপ্ত হওয়া উচিৎ বলে আমরা মনে করি। আর সেটা করা হলে সংসদ অনেক বেশি জবাবদিহিমূলক ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। যে কোনো সরকারই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যে কোনো আইন পাশ করিয়ে নিতে পারবে না।
শেষ কথা ঃ আমাদেরকে আগে ঠিক করতে লাগবে মানুষের জন্য সংবিধান নাকি সংবিধানের জন্য মানুষ। যদি মানুষের জন্যই সংবিধান হয়, তাহলে সংবিধানে অবশ্যই দেশের মানুষের ইচ্ছা ও চাহিদার প্রতিফলন ঘটাতে হবে । সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের শাসনতান্ত্রিক রক্ষা কবজ। জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক। সংবিধান কোনো ব্যক্তির নয়, দলের নয়, সংবিধান দেশের। সঙ্গত কারণেই সংবিধানে জাতির প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটা দরকার। এ জন্য আমরা মনে করি বাটি চালান দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানকে খুঁজে বের করার দরকার নেই। আমরা আছি দুই হাজার দশে। ৩৮/৪০ বছর পেছনে কেন, আমাদের তো তাকানো দরকার ৪০ পরের দিকে। ২০৫০ সালের উপযোগী করে সংবিধান তৈরি করার কথা কেন ভাবতে পারছি না আমরা? সংবিধান সংশোধনের এই কাজটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের উর্দ্ধে উঠে করা না গেলে যা-ই বলা হোক আর যেভাবেই বলা হোক. আগামীর সরকার এটাকে আওয়ামী সংবিধানই বলবে। আমরা দেশবাসী একুশ শতকের উপযোগী চমৎকার একটি সংবিধানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন